গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের ওপর সাম্প্রতিক সহিংসতা দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুরুতর ব্যর্থতারই প্রতিফলন—এমন মত দিয়েছেন মানবাধিকার ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। তাদের মতে, ধারাবাহিকভাবে গণমাধ্যমে হামলার ঘটনায় কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
শনিবার (১০ জানুয়ারি) ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা’ শীর্ষক নীতিগত সংলাপে এসব উদ্বেগ উঠে আসে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক পরিসর মূল্যায়নে সংলাপে অংশ নেন রাজনৈতিক নেতা, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীরা।
সংলাপে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাষ্ট্রীয় আইনি সহায়তা কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। বর্তমানে আগের তুলনায় প্রায় দশ গুণ বেশি মানুষ এই সেবা পাচ্ছেন। তিনি জানান, বিচারসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উচ্চ আদালতে স্থানান্তর, শক্তিশালী মানবাধিকার আইন প্রণয়ন এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সংস্কার—এসবই অন্তর্বর্তী সরকারের উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। তবে অর্থবহ সংস্কারের জন্য সময় প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমান বলেন, নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসে, মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিসর ততই সংকুচিত হয়। তিনি অভিযোগ করেন, আইনকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয় এবং সহিংসতা ও হয়রানি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের মতো গণমাধ্যমে হামলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এসব ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যর্থতারই প্রমাণ।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, মানবাধিকার সার্বজনীন—এটি কোনো আপেক্ষিক বিষয় নয়। তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর আত্মসমালোচনার আহ্বান জানিয়ে নির্বাচনের পর বৈষম্যবিরোধী আইন প্রণয়নের দাবি জানান।
ব্লাস্টের নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারা সংশোধন হলেও এর প্রয়োগ এখনও প্রশ্নবিদ্ধ। তিনি সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবু সাঈদ খান বলেন, বর্তমানে মব সহিংসতা আদালতের রায়ের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে উঠছে, যা রাষ্ট্রের জন্য অশনিসংকেত। তিনি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনী পরিবেশ তৈরিতে সরকারের ব্যর্থতার কথাও উল্লেখ করেন।
বক্তারা সার্বিকভাবে মত দেন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পরস্পর অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে গণমাধ্যম ও নাগরিক অধিকার সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তারা।