বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের একেবারে শেষ সময়ে জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন ও সম্প্রচার কমিশন গঠনের লক্ষ্যে খসড়া অধ্যাদেশ প্রকাশের সিদ্ধান্তকে ‘তাড়াহুড়ো’ ও ‘উদ্বেগজনক’ বলে আখ্যা দিয়েছে লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা আর্টিকেল নাইন্টিন। সংগঠনটি সতর্ক করেছে, এই প্রক্রিয়া স্বচ্ছতা ও আইনি যথাযথতা উপেক্ষা করে এগোলে তা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
সংগঠনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, খসড়া অধ্যাদেশ প্রকাশের পর জনমত দেওয়ার জন্য মাত্র তিন দিন সময় নির্ধারণ করা হয়েছে, যা এত গুরুত্বপূর্ণ একটি নীতিগত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিকভাবে স্বল্প। বিশেষ করে ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ মুহূর্তে এমন পদক্ষেপ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কি না সে প্রশ্নও তুলেছে তারা। আর্টিকেল ১৯-এর মতে, এই ধরনের সিদ্ধান্ত নতুন নির্বাচিত সরকারের হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত, যাতে একটি গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার কার্যকর করা যায়।
খসড়া জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন অধ্যাদেশের কাঠামো নিয়েও কঠোর সমালোচনা করেছে সংস্থাটি। তাদের ভাষ্য, কমিশনের কাঠামো, কমিশনারদের দায়িত্ব, প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা—সবকিছুই সরাসরি সরকারি নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা আমলাতান্ত্রিক প্রভাবকে আরও শক্তিশালী করবে। ফলে কমিশন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ঝুঁকিতে পড়বে এবং স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কার্যকর হতে পারবে না। এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড, বিশেষ করে ‘ইন্টারন্যাশনাল কোভেন্যান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস’ (আইসিসিপিআর)-এর ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, যেখানে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত থাকার শর্ত আরোপ করা হয়েছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের জায়গা হলো, খসড়ায় ‘সাংবাদিক’-এর সংজ্ঞা থেকে ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকদের বাদ দেওয়া হয়েছে। আর্টিকেল ১৯ বলছে, এর ফলে বিপুলসংখ্যক গণমাধ্যমকর্মী আইনি সুরক্ষা, স্বীকৃতি (অ্যাক্রেডিটেশন) ও নিরাপত্তা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন। এমন বৈষম্যমূলক সংজ্ঞা বিদ্যমান ভঙ্গুর গণমাধ্যম পরিবেশকে আরও দুর্বল করে তুলতে পারে, বিশেষ করে নির্বাচনকালীন সময় যখন সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রস্তাবিত সম্প্রচার কমিশন অধ্যাদেশেও একই ধরনের কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা রয়েছে বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। তাদের মতে, এই কাঠামো গণমাধ্যমের বহুত্ববাদ বা জনস্বার্থ সাংবাদিকতাকে উৎসাহিত করার বদলে নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব বিস্তারের পথ খুলে দেয়।
আর্টিকেল নাইন্টিন স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, বাংলাদেশ গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন প্রায় এক বছর আগে তাদের সুপারিশ জমা দিলেও সরকার তা বাস্তবায়নে অর্থবহ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। দীর্ঘ নিষ্ক্রিয়তার পর হঠাৎ করে অধ্যাদেশ আনার এই তৎপরতা সরকারের উদ্দেশ্য ও বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
সংগঠনটি সরকারকে অবিলম্বে অধ্যাদেশ জারির প্রক্রিয়া স্থগিত, সাংবাদিক-সম্পাদক-সুশীল সমাজ ও আইন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে উন্মুক্ত পরামর্শ এবং ভবিষ্যৎ যে কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে নির্বাহী নিয়ন্ত্রণমুক্ত ও পূর্ণ স্বাধীন রাখার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচনকালীন সময়ে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও অবাধ চলাচল নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং স্বাধীনতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত সংস্কারের মূল লক্ষ্য, নইলে তা গণতন্ত্রের ভিত্তিকেই দুর্বল করবে।