স্বাধীন ও সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতা দেশের গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির জন্য অপরিহার্য—এমন অভিমত ব্যক্ত করে সাংবাদিকদের মধ্যে ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন দেশের শীর্ষ গণমাধ্যমের প্রকাশক, সম্পাদক ও সাংবাদিকরা। তারা বলেছেন, স্বাধীন গণমাধ্যম কারও শত্রু নয়; বরং এটি সরকারকেই সত্য বলার সুযোগ করে দেয়। কিন্তু সাংবাদিকদের মধ্যে বিভাজন, রাজনৈতিক প্রভাব এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে গণমাধ্যম আজ সংকটে পড়েছে।
শনিবার (১৭ জানুয়ারি) রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে সম্পাদক পরিষদ ও নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) আয়োজিত ‘গণমাধ্যম সম্মিলন ২০২৬’-এ এসব কথা বলেন তারা। সম্মিলনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রকাশক, সম্পাদক, সাংবাদিক ও সাংবাদিক সংগঠনের নেতারা অংশ নেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ।
সম্মিলনের শুরুতে সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও নিউ এজ সম্পাদক নুরুল কবীর বলেন, সমাজে ভিন্নমত ও ভিন্ন কণ্ঠ থাকা গণতন্ত্রের শক্তি। এই বৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতে স্বাধীন সাংবাদিকতার পথ মুক্ত রাখা জরুরি। তিনি বলেন, গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দমনমূলক প্রবণতা একটি বিপজ্জনক ধারা তৈরি করছে, যার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ প্রয়োজন।
ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, স্বাধীন সাংবাদিকতাই একমাত্র প্রতিষ্ঠান যা সরকারকে নির্ভয়ে সত্য বলতে পারে। সরকার যদি উদার ও গণতান্ত্রিক মানসিকতা রাখে, তাহলে স্বাধীন গণমাধ্যম থেকেই তারাই সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে।
প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, ঐক্য, সংহতি ও পারস্পরিক সহানুভূতি ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য সাংবাদিকদের আরও সতর্ক ও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ বলেন, আসন্ন ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ঘিরে যে রাজনৈতিক উত্তরণ ঘটবে, সেখানে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়টি যেন নতুন সরকার গুরুত্ব দেয়—এটাই প্রত্যাশা।
সম্মিলনে বক্তারা বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের ওপর হামলা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। গত ডিসেম্বরে ঢাকায় ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো কার্যালয়ে সংঘটিত হামলার ঘটনা তুলে ধরে তারা বলেন, এসব হামলা ঠেকাতে অন্তর্বর্তী সরকার ব্যর্থ হয়েছে। হামলায় সংবাদকর্মীরা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন, ভবন ভাঙচুর ও লুটপাট হয়। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এসব হামলার নিন্দা জানিয়েছে।
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান কামাল আহমেদ বলেন, সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে সাংবাদিকতার মান বজায় রাখা কঠিন। তিনি সাংবাদিক সুরক্ষা আইন দ্রুত প্রণয়নের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন।
বক্তারা বলেন, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, পেশাদার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সাংবাদিকতা গড়ে তুলতে মালিক-সম্পাদক-সাংবাদিকদের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ হলে সেখানে ভুয়া খবর ও গুজব জায়গা করে নেয়—যা সমাজ ও রাষ্ট্র উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর।