বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০২৫ সাল নারীর অধিকার, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা প্রশ্নে এক গভীর দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের বছর হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। একদিকে নারী অধিকার সংস্কারের উদ্যোগ, নারীদের দৃশ্যমান উপস্থিতি ও প্রতিবাদ যেমন জোরালো হয়েছে, অন্যদিকে সহিংসতা, বিদ্বেষ, হেনস্তা এবং রক্ষণশীল চাপ ভয়াবহ মাত্রা নিয়েছে। রাষ্ট্র, সমাজ, ধর্ম ও রাজনীতির নানা স্তরে নারীর প্রশ্নটি ছিল বছরজুড়ে উত্তপ্ত বিতর্কের কেন্দ্রে।
নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন ঘিরে সংঘাত
২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে অন্তর্বর্তী সরকার শিরীন পারভীন হকের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের ‘নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন’ গঠন করে। কমিশনের লক্ষ্য ছিল আইন, সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে নারীদের প্রতি বিদ্যমান বৈষম্য পর্যালোচনা করে সংস্কার প্রস্তাব দেওয়া। ২০২৫ সালের এপ্রিলে কমিশন অভিন্ন পারিবারিক আইন, সমান সম্পত্তির অধিকার, কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষা এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে সুপারিশ পেশ করে।
কিন্তু এই সুপারিশ প্রকাশের পর কমিশন ও এর সদস্যদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক প্রচারণা, হুমকি ও সামাজিক আক্রমণ শুরু হয়। নারী অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, কমিশনের সদস্যদের প্রকাশ্যে হেনস্তা করা হলেও সরকার তাদের সুরক্ষা বা সুস্পষ্ট সমর্থনে দৃশ্যমান ভূমিকা নেয়নি। হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে কমিশন বাতিলের দাবিতে সমাবেশ ও হুমকি পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে।
নারী আসন নিয়ে সিদ্ধান্তে ক্ষোভ
জাতীয় সংসদে নারী আসন নিয়ে ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশন’-এর সিদ্ধান্ত নারী অধিকারকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করে। কমিশন সংরক্ষিত নারী আসন বাড়ানো ও সরাসরি নির্বাচনের সুপারিশ গ্রহণ না করায় নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের সদস্য ও বিভিন্ন নারী সংগঠন হতাশা প্রকাশ করেন। তাদের অভিযোগ, দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী হলেও ঐকমত্য কমিশনে নারীর প্রতিনিধিত্ব ছিল না এবং নারীদের সঙ্গে কোনো অর্থবহ পরামর্শ ছাড়াই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সহিংসতার ভয়াবহ চিত্র
২০২৫ সালের শুরু থেকেই নারী ও শিশু নির্যাতনের পরিসংখ্যান উদ্বেগজনক রূপ নেয়। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শুধু জানুয়ারি মাসেই নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ১ হাজার ৪৪০টি মামলা হয়। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিস কেন্দ্রের (আসক) তথ্যে দেখা যায়, জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ৫৩২ নারী শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন, ২০৭ জন নারীকে হত্যা করে স্বামী, এবং মোট ৭১১ জন নারী ধর্ষণের শিকার হন—যাদের মধ্যে ১৭৬ জন গণধর্ষণের শিকার।
মাগুরায় আট বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটায়। আন্তর্জাতিক নারী দিবস ৮ মার্চেও গাজীপুর, ঠাকুরগাঁও ও কেরানীগঞ্জে ধর্ষণের ঘটনা থামেনি। এমনকি ২০১৬ সালে শিশুধর্ষণে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত এক আসামির জামিনে মুক্ত হয়ে ঘুরে বেড়ানোর ঘটনা বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাকে আরও দুর্বল করে দেয়।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারী ও শিশু নির্যাতন বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ বিচারহীনতার দীর্ঘদিনের সংস্কৃতি। গবেষণায় দেখা গেছে, নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় সাজা কার্যকরের হার মাত্র শূন্য দশমিক ৪২ শতাংশ। তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা, ডিএনএ রিপোর্টে বিলম্ব এবং গুরুতর অপরাধেও আসামিদের জামিন নারীদের নিরাপত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
পোশাক ও শরীর ঘিরে নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি
২০২৫ সালে নারীর পোশাক ও শরীরকে কেন্দ্র করে একাধিক হেনস্তার ঘটনা সামাজিক রক্ষণশীলতার নগ্ন চিত্র তুলে ধরে। বাসে নারীর পোশাক নিয়ে অপমান, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের আপত্তিকর মন্তব্য, প্রকাশ্যে ‘ওড়না কোথায়’ প্রশ্ন তুলে হেনস্তা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে নারী প্রতিকৃতিতে জুতাপেটার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছিল নারীবিদ্বেষের প্রতীকী উদাহরণ।
প্রান্তিক নারীর দ্বিগুণ ঝুঁকি
আদিবাসী ও প্রান্তিক নারীরা ছিল সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে। গাইবান্ধায় সাঁওতাল নারীর ওপর হামলা, খাগড়াছড়িতে মারমা কিশোরী ধর্ষণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে সহিংসতা দেখিয়েছে—লিঙ্গ বৈষম্যের সঙ্গে জাতিগত ও রাজনৈতিক নিপীড়ন যুক্ত হয়েছে।
ইতিহাসে ২০২৫ স্মরণীয় হয়ে থাকবে নারীর মর্যাদা ও অস্তিত্ব রক্ষার এক কঠিন লড়াইয়ের বছর হিসেবে।