দেশের মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেকের বেশি নারী। সংখ্যার বিচারে তারাই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় ‘টার্গেট গ্রুপ’। অথচ প্রার্থী তালিকা ও নির্বাচনি প্রচারণার নেতৃত্বে নারীদের উপস্থিতি আশঙ্কাজনকভাবে কম—এমন বৈপরীত্যকে ঘিরে এবারের জাতীয় নির্বাচনে তীব্র সমালোচনা তৈরি হয়েছে। নারী অধিকারকর্মীরা বলছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর এই ‘উন্নাসিকতা’ কেবল প্রতীকী নয়, বরং নারীর নেতৃত্ব বিকাশের পথে কাঠামোগত বাধা তৈরি করছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, মোট ভোটারের ৪৯.২৬ শতাংশ নারী—সংখ্যায় ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ জন। কিন্তু মোট ১ হাজার ৯৮১ জন প্রার্থীর মধ্যে নারী মাত্র ৬৫ জন। দলীয়ভাবে মনোনয়ন পাওয়া নারী প্রার্থী ৩৮ জন। বিএনপি ও বাসদ (মার্কসবাদী) সর্বোচ্চ ১০ জন করে নারী প্রার্থী দিলেও জামায়াত বা তাদের জোট থেকে কোনো নারীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। তুলনামূলকভাবে দেখা যায়, ২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থী ছিলেন ১০১ জন, যা এবার আরও কমেছে।
এদিকে নির্বাচনি প্রচারণায় ‘মা-বোনদের উন্নয়ন’, ‘নারীর ক্ষমতায়ন’ বা ‘নিরাপত্তা’—এমন প্রতিশ্রুতির ছড়াছড়ি থাকলেও প্রার্থী নির্বাচনে সেই প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন নেই বলে অভিযোগ অধিকারকর্মীদের। তাদের মতে, ভোটের সময় নারীদের আবেগ ও সামাজিক পরিচয়কে কাজে লাগানো হলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় তাদের জায়গা দিতে রাজনৈতিক দলগুলো অনীহা দেখাচ্ছে।
ডিসেম্বরে এনসিপি ১২৫ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে ১৪ জন নারীকে মনোনয়ন দিয়েছিল। কিন্তু জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে যুক্ত হওয়ার পর দলের কয়েকজন শীর্ষ নারী নেতা পদত্যাগ করেন বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। ডা. তাসনিম জারা ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, জোট-রাজনীতির সমীকরণে নারীরা প্রথমেই ‘বলির পাঁঠা’ হচ্ছেন।
ঢাকা-১২ আসনের প্রার্থী তাসলিমা আখতার বলেন, “আমরা চেয়েছিলাম অন্তত একশত নারী সরাসরি ভোটে আসুক। কিন্তু মনোনয়ন তালিকা হতাশাজনক। তবু যারা প্রতিকূলতার মধ্যেও দাঁড়িয়েছেন, তারাই ভবিষ্যতে নেতৃত্ব দেবেন।”
‘উই ক্যান’-এর সমন্বয়ক জিনাত আরা হক মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলো নারীকে ভোটার হিসেবে মূল্য দিলেও নেতৃত্বে দেখতে চায় না। “নারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গা থেকে দূরে রাখার মানসিকতা এখনো শক্তিশালী। দুঃখজনকভাবে কিছু নারী নেত্রীরাও সেটাকে মেনে নিচ্ছেন,” বলেন তিনি।
সার্বিকভাবে, সংখ্যায় এগিয়ে থেকেও নেতৃত্বে পিছিয়ে পড়া—এ বাস্তবতা প্রমাণ করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারী অংশগ্রহণ এখনো প্রতীকী পর্যায়েই সীমাবদ্ধ। বিশেষজ্ঞদের মতে, কাঠামোগত সংস্কার ও দলীয় মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় ন্যূনতম কোটার মতো ব্যবস্থা না আনলে এই বৈষম্য দূর হওয়া কঠিন।