বাংলাদেশে প্রতি বছর মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায় মেয়েরা ছেলেদের ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়েও নারীদের উপস্থিতি প্রায় সমান। কিন্তু প্রতিযোগিতামূলক চাকরির বাজারে তাদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম। বিশেষ করে সরকারি চাকরির সবচেয়ে বড় নিয়োগ পরীক্ষা বিসিএসে নারীদের অংশগ্রহণ ক্রমেই কমছে।
বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) তথ্য অনুযায়ী, ৪৩তম বিসিএসে মোট ২,১৬৩ জনকে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়, এর মধ্যে নারী ছিলেন মাত্র ৪২১ জন। অর্থাৎ নারীর অংশ মাত্র ১৯ দশমিক ৪৬ শতাংশ। আগের বিসিএসগুলোতেও নারীর অংশগ্রহণ গড়ে ২৫ শতাংশের মতো ছিল। সাবেক পিএসসি সদস্য অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন মনে করেন, আগামী ১০–১৫ বছরে প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ে নারীর প্রতিনিধিত্বে বড় ফাঁক তৈরি হতে পারে।
নারীরা পড়াশোনায় এগিয়ে থাকলেও চাকরির প্রস্তুতি, পারিবারিক দায়িত্ব এবং কর্মক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে পিছিয়ে পড়েন। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৪৮ শতাংশ নারী। বড় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনেক বিভাগে মেয়েরা ফলাফলে শীর্ষ অবস্থান দখল করে। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে সেই সাফল্য প্রতিফলিত হয় না।
আন্তর্জাতিক সূচকেও বাংলাদেশের নারীরা পিছিয়ে। উচ্চশিক্ষায় নারী-পুরুষ অনুপাতের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে ১১০তম এবং নারীর ক্ষমতায়ন সূচকে ১৩৪তম অবস্থানে রয়েছে। বিশেষ করে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (এসটিইএম) শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ আরও কম। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে এসটিইএম শিক্ষায় নারীর অংশ মাত্র ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ।
স্কুল পর্যায়ে মেয়েরা এগিয়ে থাকলেও কর্মক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণ কমছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ ৩৯ দশমিক ২০ শতাংশ, যা ২০২২ সালে ছিল ৪২ দশমিক ৭৭ শতাংশ। অর্থাৎ দুই বছরে কমেছে প্রায় ৩ দশমিক ৫৭ শতাংশ।
কর্মক্ষেত্রে নারীরা নানা সমস্যার মুখোমুখি হন। মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান আলেয়া পারভীন লীনা বলেন, অনেক কর্মক্ষেত্র এখনও নারীবান্ধব নয়। মৌলিক সুবিধা যেমন উপযুক্ত টয়লেটও অনেক প্রতিষ্ঠানে নেই। তিনি জানান, বোর্ড মিটিংয়ে অনেক সময় তিনি একমাত্র নারী সদস্য হিসেবে উপস্থিত থাকেন।
পারিবারিক চাপও নারীদের চাকরি থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা তাহমিনা আক্তার এমু জানান, বিয়ের পর পরিবারের প্রত্যাশার কারণে তাকে চাকরি ছাড়তে হয়েছে। তার ভাষ্য, “বিয়ের পর অনেক পরিবারই আশা করে পুত্রবধূ সংসার সামলাবে।” অফিসের কাজ, সংসারের দায়িত্ব, কর্মক্ষেত্রে হয়রানি ও অনিরাপদ গণপরিবহন মিলিয়ে চাপ বাড়তে থাকায় তিনি চাকরি ছেড়ে দেন।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের নারীরা শিক্ষাক্ষেত্রে এগিয়ে থাকলেও কর্মক্ষেত্রে নানা বাধা ও সামাজিক চাপের কারণে পিছিয়ে পড়ছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং নীতিগত সহায়তা ছাড়া এই বৈষম্য দূর করা সম্ভব নয়। শিক্ষায় অর্জিত সাফল্যকে কর্মক্ষেত্রে রূপান্তরিত করতে হলে নারীদের জন্য নিরাপদ, সহায়ক ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।