বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। বাসা থেকে কর্মস্থল সব জায়গায় নারীরা নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা সবচেয়ে বেশি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি প্রকট সামাজিক বাস্তবতা। স্ত্রীকে শাসনের মাধ্যম হিসেবে সহিংসতার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বিদ্যমান পুরুষতান্ত্রিকতারই প্রতিফলন।
এমন পরিস্থিতিতে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় নারী ও শিশু নির্যাতনের তথ্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পেয়ে ব্যবস্থা নিতে “কুইক রেসপন্স স্ট্র্যাটেজি (কিউআরএস)” চালু করতে যাচ্ছে। আজ ২৫ নভেম্বর আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস পালিত হচ্ছে। এদিন থেকে শুরু হচ্ছে ১৬ দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ, যা চলবে ১০ ডিসেম্বর বিশ্ব মানবাধিকার দিবস পর্যন্ত। বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে এ দিবস পালিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্যে দেখা গেছে, গত তিন মাসে মোট ৬৭৮ জন নারী ও শিশু যৌন নিপীড়ন, ধর্ষণ ও দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। অক্টোবর মাসে ১০১ জন কন্যা ও ১৩০ জন নারী, সেপ্টেম্বরে ৯২ জন কন্যা ও ১৩২ জন নারী এবং আগস্টে ৭৯ জন কন্যা ও ১৪৪ জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এ চলতি বছরের শুরু থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ধর্ষণ, ইভটিজিংসহ নানা কারণে ২৬ হাজারের বেশি ফোন এসেছে। এর মধ্যে স্বামীর মাধ্যমে নির্যাতনের অভিযোগই সবচেয়ে বেশি।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, গতবছরের প্রথম ১০ মাসে পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা ছিল ৪২৭টি, চলতি বছরে তা বেড়ে হয়েছে ৫০৩টি। স্বামীর হাতে হত্যার সংখ্যা ২০২৪ সালে ছিল ১৫৫ জন, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯৮ জনে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী প্রতি তিনজন নারীর একজন জীবদ্দশায় সঙ্গী বা স্বামীর দ্বারা শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। সংখ্যায় তা প্রায় ৮৪ কোটি নারী। গত এক বছরে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩১ কোটি ৬০ লাখ নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
মহিলা ও শিশুবিষয়ক উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ বলেছেন, দেশে নারীর প্রতি সহিংসতা কমেনি, বরং বেড়েই চলেছে। তিনি জানান, কিউআরএস চালুর মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তথ্য পেয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগও জানিয়েছে, প্রতিদিনই ভুক্তভোগীরা তাদের কাছে আসছেন এবং তারা প্রয়োজনীয় সহায়তা দিচ্ছেন।
বেসরকারি সংস্থা নিজেরা করি’র সমন্বয়ক খুশী কবির বলেন, পরিবার, স্কুল-কলেজ ও কর্মস্থল—সব জায়গায় নারীরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে ঘরের ভেতরেই নারীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। তিনি মনে করেন, সচেতনতা বাড়ানো এবং সামাজিক স্তরে পিতৃতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণার বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। নারীকে দুর্বল না ভেবে সমান অংশীদার হিসেবে দেখলে সহিংসতা কমতে পারে।