বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় নারীর শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। বর্তমানে নারীদের সাক্ষরতার হার প্রায় ৭২ শতাংশে পৌঁছেছে এবং প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় লিঙ্গসমতা প্রায় নিশ্চিত হয়েছে। দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাতে কর্মরত শ্রমিকদের প্রায় ৬০ শতাংশই নারী, যা দেশের ৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি রপ্তানি আয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার প্রায় ৪২ শতাংশ, যা ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার তুলনায় বেশি।
তবে ক্ষমতার কাঠামোর দিকে তাকালে ভিন্ন একটি বাস্তবতা সামনে আসে। সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনে প্রায় দুই হাজার প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ৮১ জন ছিলেন নারী যা মোটের প্রায় ৪ শতাংশ। সরাসরি নির্বাচনে বিজয়ী নারীর সংখ্যাও ছিল খুবই কম, এবং তাদের বেশিরভাগই রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য। এটি প্রকৃত ক্ষমতায়নের চেয়ে প্রতীকী অংশগ্রহণের ইঙ্গিত দেয়।
করপোরেট খাতেও একই চিত্র দেখা যায়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ প্রায় এক-চতুর্থাংশ হলেও বাংলাদেশে শীর্ষ করপোরেট বা বোর্ড পর্যায়ে নারীর উপস্থিতি ১৫ শতাংশেরও কম। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যাংকিং ও সরকারি সেবায় নারীর উপস্থিতি থাকলেও মূলধননির্ভর ও উচ্চ প্রবৃদ্ধির খাতে তাদের প্রতিনিধিত্ব এখনও সীমিত।
কর্মজীবনের মাঝপথে অনেক নারীকে পেশা ছাড়তে বাধ্য করে মাতৃত্ব ও পারিবারিক দায়িত্বের চাপ। যদিও দেশে ১৬ সপ্তাহের মাতৃত্বকালীন ছুটি রয়েছে, তবুও কর্মস্থলে পুনরায় যোগদানের সহায়তা, শিশু যত্নসেবা এবং নমনীয় কর্মব্যবস্থার অভাব অনেক প্রতিভাবান নারীকে কর্মক্ষেত্র থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
নারী ক্ষমতায়ন নিয়ে প্রায়ই ধর্মীয় ব্যাখ্যার কথা বলা হয়। কিন্তু ইন্দোনেশিয়া বা মালয়েশিয়ার মতো মুসলিম-প্রধান দেশগুলোর অভিজ্ঞতা দেখায় যে বিশ্বাস ও নারীর নেতৃত্বের মধ্যে কোনো মৌলিক দ্বন্দ্ব নেই। আসল বিষয়টি হলো সামাজিক মানসিকতা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি।
বাংলাদেশ যদি সত্যিকারের ক্ষমতায়নের পথে এগোতে চায়, তবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ জরুরি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেয়েদের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, বিতর্ক, উদ্যোক্তা শিক্ষা ও নেতৃত্বমূলক কর্মকাণ্ডে আরও বেশি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে পরিবারনির্ভর রাজনীতির বাইরে গিয়ে নারীদের জন্য উন্মুক্ত মনোনয়ন ও প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করতে হবে।
একই সঙ্গে করপোরেট খাতে নেতৃত্ব পর্যায়ে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে স্পষ্ট নীতিমালা ও জবাবদিহিতা প্রয়োজন। কর্মস্থলে নমনীয় সময়সূচি, শিশু যত্নসেবা এবং কর্মজীবনে বিরতির পর পুনরায় যোগদানের সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি।
বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। তাদের নেতৃত্ব, দক্ষতা ও মেধাকে উপেক্ষা করে একটি দেশ কখনোই টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জন করতে পারে না। তাই নারী দিবসের আসল বার্তা হওয়া উচিত প্রতীকী অগ্রগতি নয়, বরং বাস্তব ক্ষমতায়নের পথে অগ্রসর হওয়া।