রাজনৈতিক বিবেচনায় দায়ের করা গণমামলায় আটক বুদ্ধিজীবী, লেখক, সাংবাদিক, শিক্ষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিকদের বিনা বিচারে আটক রাখার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে অবিলম্বে জামিনে মুক্তি ও মামলা পুনর্মূল্যায়নের আহ্বান জানিয়েছেন দেশের ৩০ জন বিশিষ্ট নাগরিক। শুক্রবার (২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) এক যৌথ বিবৃতিতে তারা এ দাবি জানান।
বিবৃতিতে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক বিবেচনায় বা কোনো মহলের আক্রোশের বশবর্তী হয়ে কয়েক হাজার গণমামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলার কোনো কোনোটিতে আসামির সংখ্যা ১২০০ থেকে ২০০০ পর্যন্ত। এতে বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী, লেখক, সাংবাদিক, শিক্ষকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগ করা হয়, অনেকের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও দেড় বছরের বেশি সময় ধরে জামিন না দিয়ে তাদের কারাগারে রাখা হয়েছে। এদের মধ্যে কয়েকজন সাংবাদিকও রয়েছেন এবং কেউ কেউ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।
বিবৃতিদাতারা বলেন, অনেক ক্ষেত্রে পেশাগত দায়িত্ব পালন বা ভিন্নমত পোষণের কারণে ব্যক্তিদের ঢালাওভাবে হত্যার অভিযোগে মামলায় যুক্ত করা হয়েছে। গ্রেফতারের পর নতুন নতুন মামলা দিয়ে জামিন প্রক্রিয়া জটিল করা হয়েছে। কোনো মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিন পেলেও অন্য মামলায় পুনরায় গ্রেফতারের নজির রয়েছে। এতে মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে বলে তারা মনে করেন।
তারা আরও বলেন, মামলা দায়েরের পর দীর্ঘ সময় পার হলেও অনেক ক্ষেত্রে তদন্ত শেষ হয়নি, চার্জশিট দেওয়া হয়নি। ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কার্যত বিনা বিচারে কারাবন্দি জীবন কাটাচ্ছেন। বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের যথাযথ চিকিৎসা না পাওয়ার বিষয়েও উদ্বেগ জানানো হয়।
বিবৃতিতে বর্তমান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের প্রসঙ্গ টেনে বলা হয়, সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও বেআইনি নিপীড়নের বিরুদ্ধে অবস্থানের কথা ঘোষণা করেছে। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গণমাধ্যমকে বলেছেন, ৫ আগস্ট ২০২৪–এর পর অনেক গণমামলা হেনস্তার উদ্দেশ্যে দায়ের হয়েছে এবং সেগুলো পুনর্মূল্যায়ন করা হবে। কেউ যেন বিনা কারণে শাস্তি না পায়, তা নিশ্চিত করার আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি।
এই প্রেক্ষাপটে বিবৃতিদাতারা সরকারের ঘোষিত অবস্থানকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় আটক বুদ্ধিজীবী, লেখক, সাংবাদিক, শিক্ষক ও বিভিন্ন পেশাজীবী নাগরিকদের মানবিক কারণে এবং সংবিধানস্বীকৃত মৌলিক অধিকারের প্রতি সম্মান দেখিয়ে অবিলম্বে জামিনে মুক্তি দেওয়া উচিত। পাশাপাশি যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত শেষে দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার আহ্বান জানানো হয়।
যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন মানবাধিকার কর্মী সুলতানা কামাল, সমন্বয়কারী খুশী কবির, ড. ইফতেখারুজ্জামান, সিনিয়র আইনজীবী জেড আই খান পান্না, নারী অধিকারকর্মী শিরীন পারভিন হক, আলোকচিত্রী ড. শহিদুল আলম, অ্যাডভোকেট সালমা আলী, মানবাধিকার কর্মী সাঈদ আহমেদ, আদিবাসী অধিকারকর্মী মেইনথিন প্রমীলাসহ মোট ৩০ জন বিশিষ্ট নাগরিক।
বিবৃতিটি পাঠিয়েছেন অ্যাডভোকেসি ও ল্যান্ড রিফর্ম সংগঠন এএলআরডি-এর নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা।
পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, গণমামলা ও দীর্ঘদিনের বিনা বিচারে আটক রাখার প্রশ্নে এ যৌথ বিবৃতি নতুন করে জনপরিসরে আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বিতর্ক জোরালো করবে।