বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সহিংসতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস কংগ্রেস ফর বাংলাদেশ মাইনরিটিজ (এইচআরসিবিএম)। সংগঠনটি জানিয়েছে, মাত্র সাত মাসে সারা দেশে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত সহিংসতায় শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
এইচআরসিবিএম-এর দাবি, এই সহিংসতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে পরিচালিত একটি দেশব্যাপী ধারাবাহিক সহিংসতার চিত্র। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে সংগঠনটি জানায়, “২০২৫ সালের ৬ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশের আটটি বিভাগ ও ৪৫টি জেলায় মোট ১১৬ জন সংখ্যালঘু নিহত হয়েছেন। এসব মৃত্যুর মধ্যে রয়েছে পিটিয়ে হত্যা, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং সন্দেহজনক মৃত্যু। এটি বিচ্ছিন্ন সহিংসতা নয়, বরং সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে লক্ষ্যভিত্তিক দেশব্যাপী নৃশংসতার প্রতিফলন।”
এর আগে মঙ্গলবার ধর্মীয় বৈষম্যের বিরুদ্ধে কাজ করা মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ দেশজুড়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর বাড়তে থাকা হামলা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে।
সংগঠনটি জানায়, বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এক বিবৃতিতে তারা উল্লেখ করে, শুধু গত বছরের ডিসেম্বর মাসেই সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে অন্তত ৫১টি সহিংস ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে।
এই ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে— ১০টি হত্যাকাণ্ড, ১০টি চুরি ও ডাকাতির ঘটনা, ২৩টি দখল, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা (যার মধ্যে বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, মন্দির ও জমি রয়েছে), ধর্ম অবমাননা ও ‘র’-এর এজেন্ট হওয়ার মিথ্যা অভিযোগে ৪টি আটক ও নির্যাতনের ঘটনা, ১টি ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা এবং ৩টি শারীরিক হামলার ঘটনা।
ঐক্য পরিষদ জানায়, সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার এই প্রবণতা জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহেও অব্যাহত রয়েছে।
সংগঠনটির তথ্যমতে, ২ জানুয়ারি লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে সত্যনারায়ণ দাসের মালিকানাধীন ৯৬ শতক জমির ধানক্ষেতে আগুন দেওয়া হয়। ৩ জানুয়ারি শরীয়তপুরে ব্যবসায়ী খোকন চন্দ্র দাসকে কুপিয়ে ও আগুন দিয়ে হত্যা করা হয়। একই দিন ভোরে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার আমুচিয়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে মিলন দাসের বাড়িতে ডাকাতি হয়, যেখানে পরিবারের সদস্যদের জিম্মি করা হয়।
৪ জানুয়ারি এক স্বর্ণ ব্যবসায়ী শুভ পদ্দারকে বেঁধে রেখে তাঁর দোকান থেকে প্রায় ৩০ ভরি (প্রায় ৩৫০ গ্রাম) স্বর্ণালঙ্কার লুট করা হয়। একই দিনে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে ৪০ বছর বয়সী এক হিন্দু বিধবা নারীকে ধর্ষণ করা হয়। তাঁকে গাছের সঙ্গে বেঁধে মাথার চুল কেটে নির্যাতন চালানো হয় বলেও অভিযোগ করেছে সংগঠনটি।
সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার এই ধারাবাহিকতায় দেশজুড়ে ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। তারা বলছে, এ ধরনের পরিস্থিতি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর শঙ্কা তৈরি করছে।
উল্লেখ্য, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাংলাদেশে হিন্দুসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সহিংসতা বাড়ছে বলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক উদ্বেগ ও প্রতিবাদ দেখা দিয়েছে। একাধিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনও এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।