ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা সাংবাদিক, লেখক ও মুক্তিযোদ্ধা শাহরিয়ার কবিরের অবিলম্বে মুক্তি এবং তার জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে তারা এই দাবি জানান।
বিবৃতিতে বলা হয়, রাষ্ট্রীয় হেফাজতে থাকা অবস্থায় শাহরিয়ার কবিরের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটেছে এবং বর্তমানে তা সংকটাপন্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন জটিল রোগে ভোগা এই প্রবীণ সাংবাদিক হুইলচেয়ার ব্যবহার করেন। গ্রেপ্তারের পর থেকে তার স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, তার ওজন আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে এবং দাঁড়িয়ে থাকাও তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। একাধিকবার আবেদন করা সত্ত্বেও তিনি প্রয়োজনীয় ওষুধ ও পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, বর্তমানে তিনি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন। সেখানে স্থানান্তরের পরও তার চিকিৎসা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও অমানবিক বলে উল্লেখ করেছে।
এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। লেমকিন ইনস্টিটিউট ফর জেনোসাইড প্রিভেনশন অ্যান্ড হিউম্যান সিকিউরিটি গত ৫ মে এক বিবৃতিতে শাহরিয়ার কবিরের আটককে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতার গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে।
এর আগে জাতিসংঘের ইচ্ছাকৃত আটক-সংক্রান্ত ওয়ার্কিং গ্রুপ তাদের অপিনিয়ন নম্বর ৪০/২০২৫–এ শাহরিয়ার কবিরের আটককে ‘ইচ্ছাকৃত, অবৈধ ও দণ্ডমূলক’ বলে অভিহিত করে। একই সঙ্গে তার তাৎক্ষণিক মুক্তি, ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং স্বাধীন তদন্তের আহ্বান জানানো হয়। তবে পূর্ববর্তী সরকার এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন করেনি বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংগঠনগুলো আরও জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সাবেক মন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুনের হেফাজতে মৃত্যুসহ একই সময়ে শতাধিক বন্দির মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হওয়ায় বন্দিদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে শাহরিয়ার কবিরের জীবনের ঝুঁকি স্পষ্টভাবে বেড়ে গেছে।
যৌথ বিবৃতিতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি তিনটি প্রধান দাবি জানানো হয়েছে। এগুলো হলো—শাহরিয়ার কবিরসহ সব প্রবীণ ও ঝুঁকিপূর্ণ বন্দির অবিলম্বে মুক্তি, তাদের জরুরি ও যথাযথ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং দেশের সব কারাগারে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও মানবিক মানদণ্ড কঠোরভাবে অনুসরণ করা।
বিবৃতিতে বলা হয়, শাহরিয়ার কবিরের জীবন রক্ষা কেবল ন্যায়বিচারের প্রশ্ন নয়, এটি মানবতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। তার নিরাপত্তা ও মুক্তি নিশ্চিত করা বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং আইনের শাসনের প্রতি অঙ্গীকারকে পুনর্ব্যক্ত করবে।
এই যৌথ আবেদনের নেতৃত্ব দেন ইউরোপীয় সংসদের সাবেক সদস্য ও দক্ষিণ এশিয়া ডেমোক্র্যাটিক ফোরামের নির্বাহী পরিচালক পাউলো কাসাকা। এছাড়া এতে অংশ নেন ক্রিস ব্ল্যাকবার্ন, ক্লাউস স্ট্রেমপেল, তারিক গুনেরসেল এবং এ বি এম নাসিরসহ ইউরোপ ও বিশ্বের বিভিন্ন নাগরিক সমাজ সংগঠনের প্রতিনিধিরা।