সর্বশেষ

বিনা বিচারে কারাবন্দি আর কতদিন?

রাজনীতিবিদ, আমলা ও সাংবাদিকদের আটক করে রাখায় আইনের শাসন নিয়ে বিতর্ক

প্রকাশিত: ১৩ মার্চ ২০২৬, ১১:০০
রাজনীতিবিদ, আমলা ও সাংবাদিকদের আটক করে রাখায় আইনের শাসন নিয়ে বিতর্ক

বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গ্রেপ্তার হওয়া সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, রাজনীতিবিদ, আমলা ও সাংবাদিকদের মধ্যে অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে আটক রয়েছেন, যদিও তাদের বিরুদ্ধে এখনও অভিযোগপত্র বা চার্জশিট দাখিল করা হয়নি। এই পরিস্থিতি নিয়ে মানবাধিকার, বিচারপ্রক্রিয়া এবং আইনের শাসন নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

 

বিভিন্ন আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীদের মতে, এক বছরেরও বেশি সময় ধরে অভিযোগপত্র ছাড়া আটক থাকার ঘটনা বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতি ও আইনি জটিলতার দিকটি সামনে নিয়ে এসেছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, কেউই বিনা বিচারে কারাগারে নেই; আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যেই তাদের আটক রাখা হয়েছে।

 

রাষ্ট্রপক্ষের ব্যাখ্যা

 

ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, দেশে “বিনা বিচারে কেউ কারাগারে বন্দি নেই।” তার দাবী অনুযায়ী, যেসব আসামির বিরুদ্ধে মামলার চার্জশিট এখনো দাখিল হয়নি, তাদের জামিনের ক্ষেত্রে আদালতে আপত্তি জানানো হয় তখনই, যখন আশঙ্কা থাকে যে তারা জামিন পেলে মামলার তদন্তে প্রভাব বিস্তার করতে পারেন অথবা পালিয়ে যেতে পারেন।

 

তিনি জানান, যাদের ক্ষেত্রে এমন আশঙ্কা নেই তাদের জামিনে আপত্তি করা হয় না এবং অনেকেই ইতোমধ্যে জামিনও পাচ্ছেন।

 

দীর্ঘদিন আটক থাকার উদাহরণ

 

তবে বাস্তবে অনেক ব্যক্তিই দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগপত্র ছাড়াই কারাগারে আছেন বলে জানা গেছে। সাবেক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ সচিব শাহ কামাল ৫৬৮ দিন ধরে কারাগারে থাকলেও তার বিরুদ্ধে এখনও অভিযোগপত্র দাখিল হয়নি।

 

সাংবাদিক ফারজানা রুপা ও শাকিল আহমদ ৫৬৫ দিন ধরে আটক আছেন চার্জশিট ছাড়াই। এছাড়া সাবেক মন্ত্রী টিপু মুনশী ৫৫৭ দিন এবং সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর ৫৪০ দিন ধরে আটক রয়েছেন।

 

গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের মধ্যে শ্যামল দত্ত এবং মোজাম্মেল হক বাবু প্রায় ৫৩৮ দিন ধরে কারাগারে আছেন। এছাড়া সাবেক ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল হক ৫১০ দিন ধরে আটক রয়েছেন।

 

প্রধান বিচারপতির জামিন

 

সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ২২৮ দিন কারাগারে থাকার পর বুধবার সব মামলায় জামিন পেয়েছেন। তার আইনজীবী মোতাহার হোসেন সাজু জানান, আদালতের আদেশ অনুযায়ী তার মুক্তির আর কোনো আইনি বাধা নেই, যদি না রাষ্ট্রপক্ষ চেম্বার আদালতে আপিল করে।

 

একই দিনে সাংবাদিক আনিস আলমগীর–কেও দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলায় জামিন দিয়েছে আদালত।

 

সাংবাদিকদের মুক্তির দাবি

 

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গ্রেপ্তার হওয়া সাংবাদিকদের মুক্তির দাবি জানিয়েছে কমনওয়েলথ জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটি বলেছে, মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে হত্যাসহ বিভিন্ন অভিযোগে এক বছরের বেশি সময় ধরে সাংবাদিকদের কারাগারে রাখা হয়েছে, যা অবিলম্বে বন্ধ করা উচিত।

 

এর আগে সম্পাদক পরিষদ ও মানবাধিকারকর্মীসহ ৬৩ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি সাংবাদিকদের নির্বিচারে আটক এবং বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

 

আইনজীবীদের মতামত

 

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরশেদ বলেন, গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর জামিনের সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। তবে অনেক আসামির বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকায় কারাগার থেকে মুক্তি পেতে সময় লাগছে।

 

আরেক সিনিয়র আইনজীবী সাইদ আহমেদ রাজা মনে করেন, বর্তমানে বন্দিদের দুই ভাগে দেখা যাচ্ছে—রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও পেশাজীবী। তার মতে, স্থানীয় পর্যায়ের অনেক রাজনৈতিক নেতাকর্মী জামিন পাচ্ছেন, কিন্তু সাংবাদিক, বিচারপতি, শিক্ষক বা সাবেক আমলাদের ক্ষেত্রে জামিন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

 

গ্রেপ্তারের পরিসংখ্যান

 

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ–এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর রাজধানীতে ৭০৬টি মামলা হয়েছে। হত্যা, দুর্নীতি এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে পাঁচ হাজারের বেশি রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

 

এই গ্রেপ্তারদের মধ্যে ২৩ জন সাবেক মন্ত্রী, ১১ জন প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী, ৬৬ জন সংসদ সদস্য এবং ৮ জন সংরক্ষিত আসনের নারী সংসদ সদস্য রয়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন পেশার অন্তত ৪৫ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। এদের মধ্যে সাতজন মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য ইতোমধ্যে জামিন পেয়েছেন।

 

এছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–এ প্রায় ২৭টি মামলা হয়েছে, যেখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা–সহ ২০৬ জনকে আসামি করা হয়েছে।

 

মানবাধিকার ও আইনের শাসন নিয়ে প্রশ্ন

 

মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, দীর্ঘ সময় অভিযোগপত্র ছাড়া আটক থাকা এবং জামিন শুনানি বিলম্বিত হওয়া আইনের শাসনের প্রশ্ন তুলছে। তাদের মতে, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে দ্রুত তদন্ত শেষ করে বিচার শুরু করা উচিত, আর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে বন্দিদের মুক্তি দেওয়া প্রয়োজন।

 

এই পরিস্থিতি দেশের বিচারব্যবস্থা, মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।

সূত্রঃ ডয়েচে ভেলে বাংলা

সব খবর

আরও পড়ুন

জানুয়ারি–ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের পরিস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ ছিল

বিএনএন এশিয়ার প্রতিবেদন জানুয়ারি–ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের পরিস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ ছিল

রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ কারাগারে ধুঁকছে

নাগরিক প্ল্যাটফর্মের সংলাপে রেহমান সোবহান রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ কারাগারে ধুঁকছে

ঢাবি শিক্ষক অধ্যাপক জামাল উদ্দীনের জামিন হয়নি

ঢাবি শিক্ষক অধ্যাপক জামাল উদ্দীনের জামিন হয়নি

রাজনৈতিক বিবেচনায় দায়ের গণমামলা পুনর্মূল্যায়ন ও আটক ব্যক্তিদের মুক্তির দাবি

৩০ বিশিষ্ট নাগরিকের বিবৃতি রাজনৈতিক বিবেচনায় দায়ের গণমামলা পুনর্মূল্যায়ন ও আটক ব্যক্তিদের মুক্তির দাবি

জামিনপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের পুনরায় গ্রেপ্তারের নির্দেশনা আইনের শাসনের পরিপন্থি

আইন ও সালিশ কেন্দ্র-এর উদ্বেগ জামিনপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের পুনরায় গ্রেপ্তারের নির্দেশনা আইনের শাসনের পরিপন্থি

বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় ‘সরাসরি আঘাত’, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার তীব্র নিন্দা

জামিনের পর আদালতে বিএনপিপন্থীদের তাণ্ডব বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় ‘সরাসরি আঘাত’, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার তীব্র নিন্দা

নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় ৭ জনের মৃত্যু, আহত ৩৫০

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন-এর উদ্বেগ নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় ৭ জনের মৃত্যু, আহত ৩৫০

প্রতিবন্ধী ও সংখ্যালঘু ভোটারদের অংশগ্রহণে ছিল নানা সীমাবদ্ধতা

ভোট-পরবর্তী সহিংসতা বেড়েছে ‘উল্লেখযোগ্য হারে’ প্রতিবন্ধী ও সংখ্যালঘু ভোটারদের অংশগ্রহণে ছিল নানা সীমাবদ্ধতা