বাংলাদেশে গত ১৬ মাসে মব সন্ত্রাস ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বাড়িঘর ও শিল্পকারখানায় অগ্নিসংযোগ, হামলা ও লুটপাট থেকে শুরু করে মাজারে আক্রমণ, বাউলদের ওপর হামলা, গণমাধ্যম অফিসে ধ্বংসযজ্ঞ—সবকিছুই ঘটেছে। তবে সবচেয়ে ভয়ংকর রূপ নিয়েছে গণপিটুনি, যেখানে চুরি, ছিনতাই, রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের অভিযোগে মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত পৌনে আট বছরে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ৫৪৭ জন। চলতি বছরের প্রথম ১১ মাসেই নিহত হয়েছেন ১৮৪ জন, যার মধ্যে ঢাকায় সবচেয়ে বেশি ৭২ জন। চট্টগ্রামে নিহত হয়েছেন ২৮ জন, খুলনায় ১৭ জন, বরিশালে ১৪ জন, রাজশাহীতে ১৩ জন, ময়মনসিংহে ১০ জন, রংপুরে ৭ জন এবং সিলেটে ৪ জন।
২০১৯ সালে সর্বোচ্চ ৬৫ জন নিহত হয়েছিলেন। এরপর ২০২৪ সালে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১২৮ জন। চলতি বছর তা আরও বেড়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
ভয়াবহ কিছু সাম্প্রতিক উদাহরণঃ
- ভালুকায় দিপু চন্দ্র দাস হত্যা: ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে পোশাকশ্রমিক দিপুকে পিটিয়ে হত্যা করা হয় এবং লাশ ঝুলিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। পুলিশ অভিযোগের সত্যতা পায়নি, তবে ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
- রংপুরে রূপলাল ও প্রদীপ হত্যা: ভ্যানচোর সন্দেহে হরিদাস সম্প্রদায়ের দুই ব্যক্তিকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়। মামলা হলেও আসামিরা দ্রুত জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।
- ঢাকার মিটফোর্ডে সোহাগ হত্যা: ভাঙারি ব্যবসায়ী সোহাগকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তাকে বিবস্ত্র করে নৃশংসভাবে আঘাত করা হয়। দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হলেও মামলার তদন্ত থেমে গেছে।
- ফরিদপুরে শাহিন শিকদার হত্যা: চোর সন্দেহে গণপিটুনিতে নিহত হন শাহিন। মামলা হলেও কোনো গ্রেপ্তার হয়নি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের পরিবর্তনের পর গণপিটুনির ঘটনা বেড়েছে। আদালত প্রাঙ্গণেও সাবেক মন্ত্রী-এমপি থেকে বিচারপতি পর্যন্ত হামলার শিকার হয়েছেন। প্রতিবন্ধী ও শিশুরাও এ বর্বরতার শিকার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে।
গণপিটুনি এখন শুধু অপরাধ নয়, বরং সামাজিক আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। গুজবের বিস্তার, আইনের প্রতি আস্থাহীনতা এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দায়মুক্তি এ সন্ত্রাসকে উসকে দিচ্ছে। বিচার না হলে এ প্রবণতা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।