পার্বত্য চট্টগ্রামে (সিএইচটি) ২০২৫ সালে মানবাধিকার পরিস্থিতির গুরুতর অবনতি ঘটেছে। আদিবাসী জুম্ম জনগোষ্ঠী ব্যাপক সহিংসতা, ভূমি দখল, সাম্প্রদায়িক হামলা, নির্বিচার গ্রেপ্তার এবং সামরিক নিপীড়নের শিকার হয়েছে—এমন তথ্য উঠে এসেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস)-এর প্রকাশিত ২০২৫ সালের বার্ষিক মানবাধিকার প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে ব্যর্থতাই এই পরিস্থিতির মূল কারণ। ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালেও চুক্তির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ধারা, বিশেষ করে মূল বিষয়গুলো, বাস্তবায়ন হয়নি।
পিসিজেএসএসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মোট ২৬৮টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে, যাতে ৬০৬ জন জুম্ম নারী, পুরুষ ও শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এসব ঘটনার জন্য সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সেনাসমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী, সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী শক্তি, রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী, বাঙালি বসতি স্থাপনকারী এবং ভূমিদস্যুদের দায়ী করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালে অন্তত ১৯৩টি জুম্ম অধ্যুষিত গ্রামে সেনা টহল ও তল্লাশি অভিযান চালানো হয়। এসব অভিযানে ৪৩টি বসতবাড়ি ও দুটি বৌদ্ধ বিহার তল্লাশি, এবং ১১৭ জন নিরীহ জুম্ম মানুষকে নির্বিচারে গ্রেপ্তার করা হয়। একই বছরে ৮ জন জুম্ম ব্যক্তি নিহত হন, যাদের মধ্যে সেনা গুলিতে নিহত ও হেফাজতে চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যুর ঘটনাও রয়েছে। এসব হত্যাকাণ্ডের কোনোটি কার্যকর বিচারিক প্রক্রিয়ার আওতায় আসেনি।
নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতাও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। প্রতিবেদনে ৩২ জন জুম্ম নারী ও কন্যাশিশুর ওপর যৌন ও শারীরিক নির্যাতনের তথ্য রয়েছে। পাশাপাশি, চরম দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে ৩০ জন ম্রো আদিবাসী শিশুকে বিনামূল্যে শিক্ষা ও চিকিৎসার প্রলোভনে মাদ্রাসায় ধর্মান্তর করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
ভূমি দখল পরিস্থিতিও অপরিবর্তিত রয়েছে। অন্তত ৩০০ একর জুম্ম মালিকানাধীন জমি অবৈধভাবে দখল করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে জুমচাষের জমি, শ্মশানভূমি ও বৌদ্ধ মন্দিরসংলগ্ন এলাকা।
প্রতিবেদন আরও জানায়, রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতায় বান্দরবানের বিভিন্ন এলাকায় অপহরণ ও হত্যার ঘটনা ঘটেছে, যা পাহাড়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
পিসিজেএসএস সতর্ক করে বলেছে, শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন, সামরিকীকরণ প্রত্যাহার, আদিবাসীদের ভূমি ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতি বন্ধ না হলে পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।