এবছরের ঈদের আগে নিজ দেশে ফেরার প্রতিশ্রুতি যা একসময় আশার আলো জ্বালিয়েছিল এক বছর পর এসে তা এখন রোহিঙ্গাদের কাছে ভেঙে পড়া স্বপ্নের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। ২০২৫ সালের ১৪ মার্চ কক্সবাজারের উখিয়ায় শরণার্থী ক্যাম্পে ইফতার অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ঘোষণা দিয়েছিলেন ২০২৬ সালের ঈদের আগেই রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের চেষ্টা করা হবে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, সেই প্রতিশ্রুতি এখনো অধরাই রয়ে গেছে।
বর্তমানে কক্সবাজারের ৩৩টি শরণার্থী শিবিরে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছেন। গত এক বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমারে ফেরানো যায়নি। বরং গত প্রায় ১৫ মাসে নতুন করে আরও ১ লাখ ৪৪ হাজার ৪৫৬ জন বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
প্রত্যাবাসন কেন থমকে?
বিশ্লেষকদের মতে, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া স্থবির থাকার প্রধান কারণ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তাহীনতা। সেখানে সরকারি বাহিনী ও আরাকান আর্মি-এর মধ্যে চলমান সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলেছে। এই সংঘাতের ফলে অবশিষ্ট রোহিঙ্গারাও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে এবং নতুন করে সীমান্তের দিকে সরে আসছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত থাকলেও বাস্তবে প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না হলে টেকসই প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়—এমন অবস্থানেই অনড় রয়েছে আন্তর্জাতিক মহল।
প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা
ইফতার অনুষ্ঠানের ঘোষণাটি রোহিঙ্গাদের মধ্যে ব্যাপক আশার সঞ্চার করেছিল। অনেকেই বিশ্বাস করেছিলেন, দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে এবার হয়তো প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় গতি আসবে। কিন্তু এক বছর পর সেই আশার জায়গায় তৈরি হয়েছে গভীর হতাশা।
উখিয়ার লম্বাশিয়া ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ রিয়াজ বলেন, “সেই সময় আমরা ভেবেছিলাম এবার সত্যিই কিছু হবে। কিন্তু এখনো আমরা একই জায়গায় পড়ে আছি।” একইভাবে আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জোবায়েরও বলেছেন, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়ায় রোহিঙ্গাদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।
সমালোচকদের মতে, এই ঘোষণা ছিল মূলত একটি ফাঁপা চটকদার মনোযোগ আকর্ষনের কৌশল, যার বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক প্রস্তুতি ছিল না। ফলে প্রত্যাশা তৈরি হলেও তা পূরণ হয়নি।
মানবিক সংকটের গভীরতা
প্রত্যাবাসন স্থবির থাকায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে মানবিক সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় খাদ্য সহায়তা হ্রাস পেয়েছে। জ্বালানি সংকটও প্রকট আকার ধারণ করেছে। অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
ক্যাম্পবাসীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঈদের মতো উৎসবও তাদের জীবনে আনন্দ বয়ে আনতে পারছে না। টেকনাফের এক শিবিরে বসবাসকারী সৈয়দ আলম বলেন, “খাবারের ব্যবস্থা ঠিক নেই, পানির সমস্যা আছে—ঈদ আর সাধারণ দিনের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।” অনেক পরিবারই সন্তানদের জন্য নতুন পোশাক কিনতে পারছে না, যা তাদের দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার চিত্র আরও স্পষ্ট করে।
নতুন সরকারের প্রতি প্রত্যাশা
বর্তমানে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করার পর রোহিঙ্গাদের মধ্যে আবারও সীমিত আশার সঞ্চার হয়েছে। তারা মনে করছেন, সুস্পষ্ট নীতিমালা ও কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।
রোহিঙ্গা নেতারা অতীতের উদাহরণ টেনে বলছেন, ১৯৭৮ ও ১৯৯২ সালে যেভাবে প্রত্যাবাসন সম্ভব হয়েছিল, তেমন উদ্যোগ আবারও নেওয়া যেতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক চাপ, আঞ্চলিক সমন্বয় এবং মিয়ানমারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা অপরিহার্য।
প্রশ্ন থেকে যায়
ঈদ আসে, ঈদ যায় কিন্তু রোহিঙ্গাদের ভাগ্য বদলায় না। প্রতিশ্রুতির পরও যখন শূন্য প্রত্যাবাসন, তখন প্রশ্ন উঠছে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান কোথায়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, প্রয়োজন বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ এবং মিয়ানমারের ভেতরে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা। তা না হলে রোহিঙ্গাদের এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট আরও গভীর হবে, আর প্রত্যাবাসনের স্বপ্ন থেকে যাবে অধরাই।