যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্বাধীন পর্যবেক্ষক সংস্থা বিএনএন এশিয়া জানিয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের জন্য পরিস্থিতি ছিল উত্তেজনাপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ। এ সময় সাংবাদিকরা শারীরিক হামলা, আইনি হয়রানি, ডিজিটাল হুমকি এবং রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছেন বলে সংস্থাটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এশিয়াজুড়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা এই সংস্থাটি তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ২০টি এশীয় দেশের গণমাধ্যম পরিস্থিতি তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনে আফগানিস্তান, ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, জাপান, চীনসহ বিভিন্ন দেশের পাশাপাশি বাংলাদেশের পরিস্থিতিও বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশেষ করে ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। নির্বাচনী সংবাদ সংগ্রহ ও প্রচারের সময় অনেক সাংবাদিক শারীরিক হামলা, মব সহিংসতা এবং ডিজিটাল হয়রানির শিকার হন।
প্রতিবেদনে ২৭ জানুয়ারি নরসিংদীতে সংঘটিত একটি ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে। ওইদিন ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্র্যাব) আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে সংঘর্ষের সময় অন্তত ১০ জন সাংবাদিক আহত হন। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এ ঘটনাকে ‘মব ভায়োলেন্স’ হিসেবে বর্ণনা করে এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতার বিষয়টি তুলে ধরে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নির্বাচনী সংবাদ কভারেজকে কেন্দ্র করে ফেব্রুয়ারিতে প্রতিশোধমূলক সহিংসতার ঘটনাও সামনে আসে। অনেক ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের ওপর সংগঠিত হামলা এবং অনলাইনে হয়রানির ঘটনা ঘটেছে, যার কিছু রাজনৈতিক প্রচারণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে অনেক সাংবাদিক এখনো বিভিন্ন মামলায় আটক রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এসব মামলাকে গণমাধ্যম সংগঠনগুলো ‘মিথ্যা ও হয়রানিমূলক’ বলে উল্লেখ করেছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের আগস্টের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায়ের করা হত্যা মামলাও রয়েছে।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে সম্পাদক পরিষদ নবনির্বাচিত সরকারের কাছে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা এসব মামলা প্রত্যাহারের আহ্বান জানায়। তাদের মতে, এসব মামলা সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি করছে এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করছে।
এছাড়া ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৮ মাসে অন্তত ১৮৯ জন সাংবাদিক চাকরি হারিয়েছেন এবং ২৯টি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে শীর্ষ পর্যায়ে পরিবর্তন এসেছে। আর্থিক সংকট ও রাজনৈতিক চাপকে এসব ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা আর্টিকেল নাইন্টিন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাবিত জাতীয় মিডিয়া কমিশন ও ব্রডকাস্টিং কমিশন সংক্রান্ত খসড়া অধ্যাদেশের সমালোচনা করেছে। তাদের মতে, এসব খসড়ার ওপর মতামত দেওয়ার জন্য খুব কম সময় দেওয়া হয়েছে এবং এতে ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকদের সুরক্ষার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
বিএনএন এশিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ছিল নাজুক অবস্থায়। যদিও সরকার সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, বাস্তবে অনেক সাংবাদিক এখনো হুমকি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ভয়ের পরিবেশের মধ্যে কাজ করছেন।