বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। ২০২৫ সালে সারাদেশে অন্তত ৭১৩টি কর্মক্ষেত্র দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৮০২ জন শ্রমিক। আগের বছর ২০২৪ সালে নিহত শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ৭৫৮ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কর্মক্ষেত্রে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে অন্তত ৪৪ জন। এই চিত্র তুলে ধরেছে বেসরকারি সংস্থা সেইফটি এন্ড রাইটস সোসাইটি (এসআরএস) পরিচালিত এক জরিপ।
১৫টি জাতীয় ও ১১টি স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত এই জরিপের ফলাফল ৩১ ডিসেম্বর ঢাকায় পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে প্রকাশ করে সংস্থাটি। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে কর্মক্ষেত্রে নিহত শ্রমিকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে পরিবহন খাতে—৩৮৫ জন, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৪৮ শতাংশ। শুধু সড়ক দুর্ঘটনাতেই প্রাণ হারিয়েছেন ৪৭৯ জন শ্রমিক। এর মধ্যে অন্তত ৭৬ জন শ্রমিক কর্মস্থলে যাতায়াতের পথে নিহত হন।
পরিবহন খাতের পর সবচেয়ে বেশি শ্রমিক নিহত হয়েছেন সেবামূলক খাতে—১৪৫ জন। এর মধ্যে রয়েছে ওয়ার্কশপ, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও অন্যান্য সেবা প্রতিষ্ঠান। নির্মাণ খাতে মারা গেছেন ১২০ জন, কৃষি খাতে ৯৪ জন এবং কলকারখানা ও উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানে নিহত হয়েছেন ৫৮ জন শ্রমিক।
জেলা হিসাবে সবচেয়ে বেশি কর্মক্ষেত্র দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ঢাকায়—৭৩ জন। এরপর চট্টগ্রামে ৫১ জন, গাজীপুরে ৩৫ জন, নারায়ণগঞ্জে ৩১ জন, ময়মনসিংহে ২৪ জন এবং বগুড়ায় ২৬ জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন। শিল্পঘন এলাকা হিসেবে ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বলে উঠে এসেছে জরিপে।
মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণে দেখা যায়, সড়ক দুর্ঘটনার পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কারণ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া—৯৬ জন। বজ্রপাতে মারা গেছেন ৭৮ জন শ্রমিক, যাদের বড় একটি অংশ কৃষিশ্রমিক। এছাড়া ওপর থেকে পড়ে ৫০ জন, পানিতে ডুবে ২৮ জন, ভারী বস্তু চাপা পড়ে ২৫ জন, আগুন ও বিস্ফোরণে ২০ জন, বিভিন্ন ধস ও দেয়াল-পাহাড় ভেঙে ১৪ জন এবং বিষাক্ত গ্যাসে শ্বাসরোধ হয়ে ৮ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।
বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, নিহতদের সবচেয়ে বড় অংশ ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সী—১৫২ জন। ৩১ থেকে ৪০ বছর বয়সে মৃত্যু হয়েছে ১৪১ জনের। অর্থাৎ অধিকাংশ নিহত শ্রমিকই দেশের তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অংশ। নিহতদের মধ্যে প্রায় ৯৮ শতাংশ পুরুষ শ্রমিক।
এসআরএস-এর নির্বাহী পরিচালক সেকেন্দার আলী মিনা বলেন, “কর্মক্ষেত্রে নিহত শ্রমিকের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, কারণ সব দুর্ঘটনার খবর গণমাধ্যমে আসে না।” তিনি বলেন, বজ্রপাতে নিহত অধিকাংশ কৃষিশ্রমিক কোনো ক্ষতিপূরণ পান না, যা সামাজিক সুরক্ষার ঘাটতি নির্দেশ করে।
সংস্থাটি মনে করছে, পরিবহন খাতে মৃত্যুর পেছনে দুর্বল সড়ক অবকাঠামো, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অদক্ষ চালক, বেপরোয়া চলাচল এবং আইন প্রয়োগে দুর্বলতা বড় কারণ। অন্যদিকে নির্মাণ ও শিল্পখাতে অনুমোদনহীন স্থাপনা, নিরাপত্তা সরঞ্জামের অভাব, প্রশিক্ষণের ঘাটতি এবং ঝুঁকিপূর্ণ বৈদ্যুতিক সংযোগ দুর্ঘটনা বাড়াচ্ছে।
এসআরএস মনে করে, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) কনভেনশনের ১৫৫ ও ১৮৭ অনুচ্ছেদের আলোকে দ্রুত আইন সংস্কার, কার্যকর নজরদারি ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার না করলে এই মৃত্যু মিছিল থামবে না। শ্রমিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের জরুরি ও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।