বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গা শরণার্থীরা এবারের ঈদও কাটাবেন ক্যাম্পে। গত বছর রমজানে শরণার্থী শিবিরে গিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন—“আগামী ঈদে বাড়ি ফিরবেন রোহিঙ্গারা।” সেই আশ্বাসে শরণার্থীদের মনে ক্ষণিকের জন্য আশার আলো জেগেছিল। কিন্তু আঠারো মাস রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকেও তার সরকার কোনো কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারেনি। ফলে প্রতিশ্রুতি থেকে গেছে কেবল কথার কথায়।
ইউনূসের সফরে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও উপস্থিত ছিলেন। তারা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে ইফতার করেছিলেন। সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও আঞ্চলিক উদ্যোগে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নতুন গতি পাবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। রোহিঙ্গা নেতারা ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, প্রতিশ্রুতিগুলো ছিল নিছক আবেগপ্রসূত বক্তব্য।
রোহিঙ্গা নেতা খিন মং বলেন, “তিনি লাখো মানুষের সামনে আবেগে বলেছিলেন। সিরিয়াসলি বলেননি।” গবেষক আলতাফ পারভেজও মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকার অনেক জনপ্রিয়তামূলক কথা বলেছে, কিন্তু প্রত্যাবাসনের জন্য কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)-এর তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১১ থেকে ১২ লাখ রোহিঙ্গা রয়েছে। স্থানীয় সূত্র বলছে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। অধিকাংশই কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ক্যাম্পে বসবাস করছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী বসতিগুলোর একটি হিসেবে এই ক্যাম্পগুলোকে বিবেচনা করা হয়। নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১ লাখ ৭০ হাজারের বেশি, যাদের অর্ধেক নারী ও শিশু।
২০১৭ সালে মিয়ানমারের সেনা অভিযানে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। জাতিসংঘ ওই অভিযানে “জাতিগত নিধনের আলামত” দেখেছিল। তবে রোহিঙ্গাদের নির্যাতন ও দেশত্যাগের ইতিহাস আরও পুরোনো। ১৯৭৮ ও ১৯৯১–৯২ সালেও একই ধরনের সামরিক অভিযানের কারণে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। প্রায় পাঁচ দশক ধরে সংকট জমে থেকে ২০১৭ সালে তা চূড়ান্ত রূপ নেয়।
বাংলাদেশ সরকার শুরু থেকেই রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ওপর জোর দিয়েছে। মিয়ানমারের কাছে আট লাখের বেশি রোহিঙ্গার তালিকা দেওয়া হয়েছে। মিয়ানমারও প্রথম ধাপে প্রায় এক লাখ ৮০ হাজারকে ফেরত নেওয়ার যোগ্য বলে যাচাই করেছে। কিন্তু নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও স্বাধীন চলাচলের নিশ্চয়তা ছাড়া রোহিঙ্গারা ফিরতে রাজি নয়। ২০১৮ ও ২০১৯ সালের প্রত্যাবাসন উদ্যোগও ব্যর্থ হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ফোর্টিফাই রাইটসের পরিচালক জন কুইনলি মনে করেন, ইউনূসের মন্তব্য ছিল “ওভার অপটিমিসটিক।” তার মতে, এটি কোনো নীতিগত অবস্থান ছিল না, বরং আশাবাদ তৈরির জন্য বলা হয়েছিল। তিনি আরও বলেন, বৈশ্বিক বাস্তবতায় রোহিঙ্গা সংকট এখন আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকারে নেই। ফলে আর্থিক সহায়তাও কমছে।
মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট প্রত্যাবাসনকে আরও জটিল করেছে। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে দেশটিতে কার্যত গৃহযুদ্ধ চলছে। রাখাইন রাজ্যে বিদ্রোহী সংগঠন আরাকান আর্মি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। ফলে শুধু নেপিদোর সঙ্গে আলোচনা করে সমাধান পাওয়া কঠিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ মনে করেন, রোহিঙ্গা সংকট এখন মানবিক ইস্যু নয়, বরং জটিল ভূরাজনৈতিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের পর থেকে প্রায় দেড় লাখ নতুন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এতে ক্যাম্পে চাপ বেড়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের সংঘাত অব্যাহত থাকলে প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা সীমিত, বরং সংকট আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
দীর্ঘ অনিশ্চয়তা ও সীমিত সুযোগের কারণে অনেক রোহিঙ্গা ক্যাম্প ছেড়ে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার দিকে পাড়ি দিচ্ছে। মানব পাচারকারী চক্রগুলো এ সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা থাকার কারণে স্থানীয় অর্থনীতি, পরিবেশ ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, সীমান্ত অঞ্চল মাদক পাচারের নিরাপদ রুটে পরিণত হয়েছে। ক্যাম্পে তরুণদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের অভাব তাদের অপরাধপ্রবণ করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান একটিই—প্রত্যাবাসন। তবে তা হতে হবে স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও মর্যাদার সাথে। বর্তমান বাস্তবতায় তা কতটা সম্ভব, সেটিই বড় প্রশ্ন। নতুন সরকারকে কার্যকর কৌশল ও নীতি গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন জন কুইনলি। তার মতে, রোহিঙ্গাদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের দিকে জোর দিতে হবে, যেন তারা অপরাধে জড়িয়ে না পড়ে।
ইউনূসের প্রতিশ্রুতি থেকে রোহিঙ্গাদের মনে যে আশার আলো জেগেছিল, তা নিভে গেছে। প্রায় ২০ লাখ মানুষের আরেকটি ঈদ কাটবে ভিনদেশে, উদ্বাস্তু হয়ে—নিজ জন্মভিটায় ফেরার অপেক্ষায়।