২০২৫ সাল বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির জন্য এক অন্ধকার অধ্যায় হয়ে থাকবে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিদায়ী বছরে মব সন্ত্রাস, কারা হেফাজতে মৃত্যু, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং রাজনৈতিক সহিংসতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।
আসকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে গণপিটুনি বা মব সন্ত্রাসে ১৯৭ জন নিহত হয়েছেন, যা আগের বছরের তুলনায় অনেক বেশি (২০২৪ সালে নিহত হয়েছিলেন ১২৮ জন)। ময়মনসিংহের ভালুকায় গার্মেন্ট শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাসকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা এবং মৃতদেহে আগুন দেওয়ার ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে। তদন্তে অভিযোগের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।
রংপুরের তারাগঞ্জে ভ্যানচোর সন্দেহে দুই শ্রমজীবী মানুষকে হত্যা, চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে কিশোর মাহিনকে চোর সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা—এসব ঘটনা প্রমাণ করে, গুজব ও উগ্রবাদী উসকানিতে সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য করে ভয়াবহ সহিংসতা চালানো হয়েছে। আসক বলছে, অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় না আনার প্রবণতা এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছে।
২০২৫ সালে কারাগারে ১০৭ জন বন্দি মারা গেছেন, যা ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ (৬৫ জন)। এর মধ্যে ৬৯ জন হাজতি এবং ৩৮ জন কয়েদি ছিলেন। সর্বাধিক মৃত্যু ঘটেছে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। সাবেক শিল্পমন্ত্রী ও মুক্তিযোদ্ধা নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূনের মৃত্যু বিশেষভাবে আলোচিত হয়। মৃত্যুর পরও তাঁর হাতকড়া বাঁধা অবস্থায় ছবি প্রকাশিত হলে জনমনে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ ওঠে, বন্দিদের সঙ্গে আচরণে মানবাধিকার মানদণ্ড মানা হচ্ছে না।
আসক জানায়, ২০২৫ সালে কথিত বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ারে ৩৮ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২৬ জন যৌথ বাহিনীর হেফাজতে বা বন্দুকযুদ্ধে মারা যান, আর ১২ জন বিভিন্ন থানায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে মারা যান। এসব ঘটনায় স্বাধীন তদন্তের অভাব এবং তথ্যের স্বচ্ছতা না থাকায় দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
গত বছর দেশে ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ১০২ জন নিহত এবং ৪,৭৪৪ জন আহত হয়েছেন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সংঘর্ষে ১০ জন নিহত হন, বিএনপি ও জামায়াতের সংঘর্ষে নিহত হন তিনজন। বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে অন্তত ৩৯ জন প্রাণ হারান। আসক বলছে, এসব ঘটনা রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের সংকট ও সহিংসতার সংস্কৃতিকে তুলে ধরে।
২০২৫ সালে ৩৮১ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ২৩ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্যাতন ও হুমকির শিকার হয়েছেন। প্রকাশিত সংবাদ বা মতামতের কারণে ১২৩ জন সাংবাদিক মামলার সম্মুখীন হয়েছেন। পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় সরাসরি হামলার শিকার হয়েছেন ১১৮ জন। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়েছে, যা বাক্স্বাধীনতার ইতিহাসে অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
আসক ও এমএসএফ উভয় সংস্থা বলছে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পরিবর্তন মানবাধিকার পরিস্থিতিতে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি আনতে পারেনি। বরং পুরোনো নিপীড়ন পদ্ধতির ধারাবাহিকতা নতুন রূপে চলছে। গুম প্রতিরোধে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে অস্থিরতা, গণগ্রেপ্তার এবং গণমাধ্যমের ওপর হামলার ঘটনা জনমনে শঙ্কা তৈরি করেছে।