ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মধ্যে দীর্ঘদিনের আলোচিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) চূড়ান্ত ঘোষণার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। সংশ্লিষ্ট সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, আগামী ২৭ জানুয়ারি এই চুক্তির রাজনৈতিক ঘোষণা আসতে পারে, যা বাস্তবায়িত হলে দুই পক্ষের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করবে।
আগামী ২৫ থেকে ২৮ জানুয়ারি ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা ও ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েনের ভারত সফরকালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে এই ঐতিহাসিক ঘোষণা আসার সম্ভাবনা রয়েছে। সূত্রগুলো বলছে, চুক্তির আওতায় ইউরোপীয় গাড়ি ও মদের ওপর ভারতের উচ্চ আমদানি শুল্ক উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হবে। এর বিনিময়ে ভারতের তৈরি পোশাক, গয়না, ইলেকট্রনিক্স ও রাসায়নিক পণ্যের জন্য ইউরোপের বিশাল বাজার আরও উন্মুক্ত হবে।
বাণিজ্য চুক্তির পাশাপাশি ভারত ও ইইউ একটি নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের দিকেও এগোচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের পর ভারতই হবে এশিয়ার তৃতীয় দেশ, যার সঙ্গে ইউরোপ এই ধরনের প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব গড়ে তুলবে। একই সঙ্গে উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী ও শিক্ষার্থীদের চলাচল সহজ করতে একটি ‘মোবিলিটি এগ্রিমেন্ট’ স্বাক্ষরের সম্ভাবনাও রয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারত ও ইইউ-এর মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৩৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার, যা ইইউকে ভারতের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদারে পরিণত করেছে। তবে চুক্তির চূড়ান্ত ঘোষণার পর ইউরোপীয় পার্লামেন্টে অনুমোদনের জন্য আরও অন্তত এক বছর সময় লাগতে পারে।
বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই চুক্তিকে ভারতের জন্য অত্যন্ত কৌশলগত বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতীয় আমদানির ওপর শুল্ক বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত করার পর বিকল্প বাজারের সন্ধানে ভারত এখন তৎপর।
দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে উরসুলা ফন ডার লিয়েন জানিয়েছেন, চুক্তিটি চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকলেও কিছু স্পর্শকাতর বিষয়ে এখনো দরকষাকষি চলছে। এর মধ্যে গাড়ি আমদানিতে ভারতের উচ্চ শুল্ক হ্রাস অন্যতম, যা কমলে ফক্সওয়াগন ও রেনল্টের মতো ইউরোপীয় নির্মাতারা ভারতের বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক হতে পারবে।
তবে নয়াদিল্লি ইইউ-এর নতুন কার্বন ট্যাক্স এবং জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহার নিয়ে উদ্বিগ্ন। ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মতে, এতে প্রায় ১ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
দিল্লির থিঙ্ক ট্যাঙ্ক গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তবের মতে, এই এফটিএ ভারতের তৈরি পোশাক ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখবে এবং বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে সমান তালে পাল্লা দিতে সহায়ক হবে।