ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করেছে যুক্তরাষ্ট্র। শনিবার ভোরে রাজধানী কারাকাসে চালানো এক বিশেষ অভিযানে মার্কিন ডেল্টা ফোর্স মাদুরোর বাসভবনে প্রবেশ করে তাঁদের গ্রেপ্তার করে। পুরো অভিযান ফ্লোরিডার মার-আ-লাগো রিসোর্ট থেকে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
সূত্র জানায়, গত আগস্ট থেকেই সিআইএ ভেনেজুয়েলার ভেতরে একটি গোপন দল মোতায়েন করেছিল। তাদের কাজ ছিল মাদুরোর প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর নজর রাখা। মাদুরো কখন ঘুমান, কী খান, এমনকি তাঁর পোষা প্রাণীর অবস্থানও গোয়েন্দাদের জানা ছিল। ভেনেজুয়েলার সরকারের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে সিআইএ সোর্স হিসেবে ব্যবহার করে অভিযানের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এই তথ্যের ভিত্তিতেই অভিযান নিখুঁতভাবে পরিচালিত হয়।
নভেম্বরে ট্রাম্প ও মাদুরোর মধ্যে একটি গোপন ফোনালাপ হয়। ট্রাম্প সরাসরি মাদুরোকে দেশ ছাড়ার আল্টিমেটাম দেন। মাদুরো তা প্রত্যাখ্যান করলে ক্রিসমাসের আগে ট্রাম্প অভিযানের অনুমতি দেন। অবশেষে শুক্রবার রাতে ট্রাম্প কমান্ডোদের উদ্দেশে বলেন, “গুড লাক অ্যান্ড গডস্পিড।”

অভিযান শুরু হতেই ২০টি মার্কিন ঘাঁটি থেকে ১৫০টিরও বেশি যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার আকাশে ওঠে। সাইবার কমান্ড কারাকাসের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও যোগাযোগ মাধ্যম অচল করে দেয়। রাত ২টা ১ মিনিটে ডেল্টা ফোর্সের কমান্ডোরা মাদুরোর কম্পাউন্ডে প্রবেশ করে। রক্ষীদের সঙ্গে গোলাগুলি হয়। মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সেফ রুমে পালানোর চেষ্টা করলেও কমান্ডোরা তাঁদের আটক করে।
আটকের পর মাদুরোকে প্রথমে মার্কিন যুদ্ধজাহাজে নেয়া হয়, পরে গুয়ান্তানামো বে কারাগার হয়ে নিউইয়র্কে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে তিনি ব্রুকলিনের মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারে বন্দি আছেন।
অভিযান শেষে ট্রাম্প ঘোষণা করেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন থেকে ভেনেজুয়েলা পরিচালনা করবে এবং দেশটির তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নেবে। তিনি মাদুরোকে আটকের দৃশ্যকে “টেলিভিশন শো দেখার মতো” বলে বর্ণনা করেন। তবে মার্কিন কংগ্রেসের অনেক সদস্য এই অভিযানের দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ও মাদুরোকে আটক করার দাবির পর বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান: প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দাবি করেন, অভিযানের পর মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করে দেশটির বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফার ল্যান্ডাউ একে ‘নতুন ভোর’ বলে অভিহিত করেন।
কলম্বিয়া: প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো এক্সে ধারাবাহিক পোস্টে বলেন, শান্তি, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং মানবিক মর্যাদা সব ধরনের সংঘাতের ঊর্ধ্বে থাকা উচিত। তিনি আগ্রাসন প্রত্যাখ্যান করে সীমান্তে সেনা মোতায়েনের ঘোষণা দেন।
কিউবা: প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াস-কানেল যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ’ আখ্যা দিয়ে জরুরি আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার আহ্বান জানান। হাভানা থেকেও একই ধরনের বিবৃতি প্রকাশিত হয়।
ইরান: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একে ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে নিন্দা জানিয়েছে।
রাশিয়া: মস্কো গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, ভেনেজুয়েলাকে বাইরের সামরিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার থাকতে হবে। তারা সংলাপের মাধ্যমে সংকট সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়া: রিপাবলিকান সিনেটর মাইক লি জানান, মাদুরো আটক হওয়ার পর আর কোনও সামরিক পদক্ষেপের পরিকল্পনা নেই। তাঁর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে ফৌজদারি অভিযোগ আনা হবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন: পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতিবিষয়ক উচ্চ প্রতিনিধি কাজা কালাস বলেন, ইইউ শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের পক্ষে এবং আন্তর্জাতিক আইন মানার আহ্বান জানাচ্ছে। ইইউ নাগরিকদের নিরাপত্তাকে তারা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।
স্পেন: উত্তেজনা কমানো ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান জানানোর আহ্বান জানিয়েছে। সংকট সমাধানে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে।
ইতালি: প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি জানিয়েছেন, তিনি ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। সেখানে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার ইতালীয় নাগরিক বসবাস করছেন, যাদের অধিকাংশেরই দ্বৈত নাগরিকত্ব রয়েছে।
কারাকাসের রাস্তায় এখন জনশূন্যতা, আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা। জনগণ জানে না, আগামী দিনে ক্ষমতা কার হাতে যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে। দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন গভীর সংকটে নিমজ্জিত।