মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় আকারের সংঘাতের সূচনা হয়েছে ইরানে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক অভিযানের মধ্য দিয়ে। শনিবার ভোরে ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনায় ‘আগাম প্রতিরোধমূলক’ হামলা চালানোর কথা নিশ্চিত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। একই সময়ে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ এ অভিযানকে ইসরায়েল রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেন।
তেহরানে বিস্ফোরণ, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আঘাত
কাতারভিত্তিক আল জাজিরা এবং ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানায়, রাজধানী তেহরানের কেন্দ্র, উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। ইরানি বার্তা সংস্থা ফার্স নিউজ এজেন্সি দাবি করেছে, ইউনিভার্সিটি স্ট্রিট, জামহুরি এলাকা, সৈয়দ খানদানসহ বিভিন্ন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। তেহরানে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, গোয়েন্দা কার্যালয়, পারমাণবিক শক্তি সংস্থা এবং পারচিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়।

অভিযানের নাম দিয়েছে দুই দেশই—ইসরায়েলের অভিযানের নাম ‘রোরিং লায়ন’ (গর্জনরত সিংহ), আর যুক্তরাষ্ট্রের ‘দ্য এপিক ফুরি’ (মহাতাণ্ডব)। মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, হামলার আওতা ‘ছোট নয়’ এবং এটি কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে।
ট্রাম্পের বক্তব্য: ‘ব্যাপক ও চলমান’ অভিযান
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও বার্তায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, “ইরানি শাসকদের হুমকি নির্মূল ও মার্কিনিদের সুরক্ষার স্বার্থে এই অভিযান চলছে।” তিনি ইরানিদের উদ্দেশে শাসনব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার আহ্বানও জানান। ট্রাম্প স্বীকার করেন, অভিযানে মার্কিন সেনাদের প্রাণহানির ঝুঁকি রয়েছে, তবে এটিকে তিনি ‘ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ’ হিসেবে আখ্যা দেন।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও সমালোচনা শুরু হয়েছে। মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড জে. মারকি হামলাকে ‘অবৈধ ও অসাংবিধানিক’ বলে মন্তব্য করে বলেন, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া এমন পদক্ষেপ আঞ্চলিক যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়াবে।
খামেনি ও শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, অভিযানের লক্ষ্য ছিল ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা। তবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরগাচি দাবি করেছেন, খামেনি জীবিত ও নিরাপদে আছেন।

অন্যদিকে রয়টার্সের খবরে ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আমির নাসিরজাদেহ ও রেভলুশনারি গার্ডস প্রধান মোহাম্মদ পাকপুর নিহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হলেও তা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি।
ইসরায়েলে জরুরি অবস্থা, ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
হামলার পর ইসরায়েলজুড়ে ‘বিশেষ ও স্থায়ী জরুরি অবস্থা’ জারি করা হয়। স্থানীয় সময় সকাল সোয়া ৮টা থেকে সাইরেন বাজতে থাকে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানায়, ইরান থেকে ইসরায়েলের দিকে অন্তত ৩৫টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ধ্বংস করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।

ইরানের বিপ্লবী রক্ষা বাহিনী জানিয়েছে, ‘শত্রুরা পুরোপুরি পরাস্ত না হওয়া পর্যন্ত’ তাদের সামরিক অভিযান চলবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে সব মার্কিনি ও ইসরায়েলি স্থাপনা এখন বৈধ লক্ষ্যবস্তু।
উপসাগরীয় ঘাঁটিতে আঘাত, আকাশসীমা বন্ধ
ইরান কাতারের আল-উদেইদ, কুয়েতের আল-সালেম, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল-ধাফরা এবং বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদরদপ্তরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করেছে। বাহরাইন এক হামলার কথা নিশ্চিত করেছে। কাতার দাবি করেছে, তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে।

কাতার, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে। সৌদি আরব জানিয়েছে, রিয়াদ ও পূর্বাঞ্চলে হামলা প্রতিহত করা হয়েছে।
হতাহতের খবর, ইন্টারনেট ও সাইবার বিঘ্ন
ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় হরমোজগান প্রদেশের মিনাব ও জাস্ক শহরে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৭০ জন নিহত ও ৯০ জনের বেশি আহত হয়েছেন বলে ফার্স জানিয়েছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় ইন্টারনেট সংযোগ ৫০ শতাংশের বেশি কমে গেছে বলে জানিয়েছে নেটব্লকস। রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যমগুলোর ওয়েবসাইটে সাইবার হামলার অভিযোগও উঠেছে।

যুক্তরাজ্য অংশ নেয়নি, বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া
যুক্তরাজ্য অভিযানে অংশ নেয়নি বলে জানিয়েছে বিবিসি। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার জরুরি নিরাপত্তা বৈঠক ডেকেছেন। লন্ডন বলেছে, তারা বিস্তৃত আঞ্চলিক যুদ্ধ চায় না।
হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহন আংশিক স্থগিত করেছে কয়েকটি জ্বালানি কোম্পানি, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের প্রভাব: ফ্লাইট স্থগিত
উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যগামী সব ফ্লাইট সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে কর্তৃপক্ষ। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এক মুখপাত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স জানিয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এসব ফ্লাইট বন্ধ থাকবে।

বিস্তৃত সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে মধ্যপ্রাচ্য
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কয়েক দফা আলোচনার পর এই হামলা সংঘটিত হওয়ায় কূটনৈতিক প্রক্রিয়া কার্যত ভেঙে পড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান স্পষ্ট—তারা কেবল সামরিক সক্ষমতা নয়, ইরানের শাসন কাঠামোতেও চাপ তৈরি করতে চাইছে। অপরদিকে তেহরান পাল্টা আঘাত ও আঞ্চলিক বিস্তৃতি ঘটিয়ে সংঘাতকে বহু-দেশীয় পর্যায়ে নিয়ে গেছে।

এই পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। আকাশসীমা বন্ধ, জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত, সাইবার হামলা—সব মিলিয়ে এটি সামরিকের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও তথ্যযুদ্ধেরও রূপ নিচ্ছে।
পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়া এ সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হতে পারে।