নেপালের সাম্প্রতিক সংসদ নির্বাচনে বড় ধরনের চমক দেখিয়েছে নতুন রাজনৈতিক শক্তি। প্রাথমিক ফলাফলে এগিয়ে রয়েছেন র্যাপার থেকে রাজনীতিক হয়ে ওঠা কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র বালেন্দ্র শাহ। তার দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসনে এগিয়ে থাকায় তিনি দেশটির পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
নেপালের নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক গণনায় দেখা গেছে, দেশটির প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনে আরএসপি প্রায় ১১০টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে ঐতিহ্যবাহী দল নেপালি কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউনিফাইড মার্ক্সিস্ট-লেনিনিস্ট) (সিপিএন-ইউএমএল) অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে।
চূড়ান্ত ফলাফলে ১৬৫টি আসন সরাসরি ভোটে এবং ১১০টি আসন আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, কয়েক দিনের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গ ফল ঘোষণা করা হতে পারে।
এবারের নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়েছে গত সেপ্টেম্বরের ছাত্র-যুব নেতৃত্বাধীন গণআন্দোলনের পর। ওই আন্দোলনে ৭৭ জন নিহত হওয়ার পর তীব্র জনচাপের মুখে পদত্যাগ করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কে.পি. শর্মা ওলি। সেই রাজনৈতিক অস্থিরতার পরই নতুন নেতৃত্বের দাবিতে তরুণদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া তৈরি হয়।
এই প্রেক্ষাপটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিপুল জনপ্রিয়তা থাকা বালেন্দ্র শাহ তরুণ ভোটারদের বড় অংশের সমর্থন পেয়েছেন। একসময় সরকারের সমালোচনামূলক র্যাপ গানের জন্য পরিচিত শাহ ২০২২ সালে কাঠমান্ডু শহরের মেয়র নির্বাচিত হয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক সেবার উন্নয়নে নেওয়া উদ্যোগ তার জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়ে দেয়।
তবে মেয়র থাকাকালে কিছু বিতর্কও তৈরি হয়েছিল। রাস্তার হকার ও ভূমিহীনদের উচ্ছেদে পুলিশ ব্যবহার করার অভিযোগে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি।
রাজনীতির মূল ধারার বাইরে থেকে উঠে আসা শাহ গণমাধ্যমের তুলনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই বেশি সক্রিয়। ফেসবুকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে তার অনুসারীর সংখ্যা ৩৫ লাখেরও বেশি। সংক্ষিপ্ত বার্তার মাধ্যমে তরুণদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখার কৌশল তাকে আলাদা করে তুলেছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
শাহের রাজনৈতিক যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে আরএসপি। দলটির নেতৃত্বে আছেন সাবেক টেলিভিশন উপস্থাপক থেকে রাজনীতিক হওয়া রবি লামিছানে। গত ডিসেম্বরেই শাহ দলটির প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী ময়দানে নামেন।
আরএসপির নির্বাচনী ইশতেহারে পাঁচ বছরের মধ্যে ১২ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিদেশমুখী শ্রমপ্রবাহ কমানো এবং মাথাপিছু আয় দ্বিগুণ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতির আকার ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা এবং সবার জন্য স্বাস্থ্যবিমা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শাহ প্রধানমন্ত্রী হলে নেপালের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি পুরোনো দলের প্রভাবের মধ্যে থাকা দেশটির রাজনীতিতে নতুন নেতৃত্বের উত্থান ঘটতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, প্রশাসনিক দুর্নীতি ও জটিল আমলাতান্ত্রিক কাঠামো সংস্কার করা শাহের জন্য সহজ হবে না। শক্তিশালী দল ও দক্ষ বিশেষজ্ঞদের সমন্বয় না করতে পারলে তার জন্য ক্ষমতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।