দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি বাধ্যতামূলক করার দাবি নাকচ করে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর বিদ্যমান বিধানকে বৈধ ঘোষণা করেছে হাই কোর্ট। আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, দ্বিতীয় বিয়ের জন্য প্রথম স্ত্রীর অনুমতির পরিবর্তে সালিশ পরিষদ (আরবিট্রেশন কাউন্সিল) থেকে অনুমতি নেওয়ার যে বিধান রয়েছে, তা সংবিধানসম্মত ও আইনগতভাবে বৈধ।
এই বিধানকে চ্যালেঞ্জ করে ২০২২ সালের জানুয়ারিতে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে রিট আবেদন করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান। রিটে তিনি দাবি করেন, স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি বাধ্যতামূলক করা না হলে তা নারীদের সমান অধিকার নিশ্চিত করে না এবং সংবিধানের চেতনার পরিপন্থি।
বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি সৈয়দ জাহেদ মনসুরের সমন্বয়ে গঠিত হাই কোর্ট বেঞ্চ গত বছরের আগস্টে রায় ঘোষণা করে। পরে ডিসেম্বর মাসে রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি প্রকাশিত হয়। রায়ে আদালত বলেন, মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৬ ধারায় দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি প্রদানের প্রক্রিয়া কোনোভাবেই বৈষম্যমূলক বা খামখেয়ালি নয় এবং এটি নারী কিংবা পুরুষ—কোনো পক্ষের মৌলিক অধিকার খর্ব করে না।
আদালত রায়ে উল্লেখ করে, ইসলামী আইনে বহুবিবাহ অনুমোদিত হলেও তা কঠোর শর্তসাপেক্ষ। কোরআনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, একাধিক স্ত্রীর প্রতি ন্যায়বিচার করতে অক্ষম হওয়ার আশঙ্কা থাকলে একজনকেই বিবাহ করার নির্দেশকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, একজন পুরুষ তখনই একাধিক বিবাহ করতে পারেন, যখন তিনি ন্যায়পরায়ণতা বজায় রাখতে এবং সব স্ত্রীর ভরণপোষণ দিতে আর্থিকভাবে সক্ষম হন।
রায়ে আরও বলা হয়, সালিশ পরিষদ দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি দেওয়ার সময় প্রস্তাবিত বিয়ের প্রয়োজনীয়তা, ন্যায্যতা এবং বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের সম্মতির বিষয় বিবেচনায় নেয়। এই প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্তের কারণ লিখিতভাবে লিপিবদ্ধ করার বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট পক্ষ মহকুমা হাকিমের কাছে পুনর্বিচারের আবেদন করতে পারে, যার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলে গণ্য হয়।
আদালত মত দেয়, মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের এই বিধান সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদের সমতা ও বৈষম্যবিরোধী নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। বরং এটি সংবিধানের ৪১ অনুচ্ছেদে বর্ণিত ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিপূরক।
তবে রায়ে আদালত একটি পর্যবেক্ষণও দেয়। বলা হয়, সরকার চাইলে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বহুবিবাহ অনুমোদন বা হাই কোর্টের পূর্ববর্তী সুপারিশ অনুযায়ী বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করার বিষয়ে একটি ফোরাম গঠন করতে পারে। এতে দেশে বহুবিবাহ সংক্রান্ত চলমান বিতর্কের অবসান ঘটতে পারে।
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় আইনজীবী ইশরাত হাসান জানান, বর্তমান আইনে দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে স্ত্রীর অনুমতি বাধ্যতামূলক না রেখে সালিশ পরিষদের ওপর সিদ্ধান্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যা তিনি চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। হাই কোর্ট রিট খারিজ করায় বিদ্যমান বিধানই বহাল থাকছে। তবে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে বলেও জানান তিনি।