সর্বশেষ

প্রয়াণদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি

সুফিয়া কামালের সাধনাশক্তি

প্রকাশিত: ২২ নভেম্বর ২০২৫, ০৭:০০
বাংলাদেশের নারী আন্দোলন, মানবাধিকার, সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাসে বেগম সুফিয়া কামাল এক অনন্য উজ্জ্বল নাম। কবি পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মানবিকতার পথিকৃৎ, প্রগতিশীল চেতনার আলোকবর্তিকা এবং নিপীড়িত মানুষের সত্যকথার নির্ভীক কণ্ঠ ছিলেন তিনি। ২০ নভেম্বর ছিল তাঁর প্রয়াণদিন। আমরা স্মরণ করি তাঁর অদম্য সাধনাশক্তি, সংগ্রামী জীবন ও মানবমুক্তির প্রতি আজীবন নিবেদিত মননচর্চাকে।
সুফিয়া কামালের সাধনাশক্তি

দেশের নারী আন্দোলনসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব কবি বেগম সুফিয়া কামাল। সরাসরি রাজনীতির চেয়ে মানবিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক দিকেই তাঁর প্রবল ঝোঁক বা প্রবণতা দৃশ্যমান হয়। আর তাই তাঁর কবি পরিচয়কে ছাপিয়ে উঠেছে দেশ ও সমাজের সার্বিক কল্যাণ-অভিমুখী তাঁর যাবতীয় কর্মকাণ্ড। উদার মানবতাবাদী ভাবধারা বিকাশে আমৃত্যু সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। অসীম দৃঢ়তা ছিলো সত্যকাজে, গভীর প্রত্যয় ছিলো মানবিক সমাজ সৃজনে, আপনার সত্যকাজের পথে পদচারণায়। কর্মপরিসর ছিল তাঁর বিশাল। তাঁর লেখায় যেমন বড়দের জন্য পাঠের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে তেমনি ছোটদের জন্য তাঁর কলম সৃষ্টি করেছে কালজয়ী সব রচনা। এমন যে মহীয়সী নারী, তাঁর সংগ্রামী জীবনের কেন্দ্রে ছিল নারীমুক্তির বিষয়টি। ব্যক্তিগত সংগ্রাম থেকে নারী আন্দোলন এবং তা থেকে বৃহত্তর জাতীয় আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে পিছপা হননি কখনোই। মহাপ্রয়াণ দিনে ‘অদম্য’ সুফিয়া কামাল (জন্ম: ২০ জুন ১৯১১ – মহাপ্রয়াণ : ২০ নভেম্বর ১৯৯৯), সকলের প্রিয় ‘খালাম্মা’র অমর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।  

 

কবি সুফিয়া কামালের জীবনী ও সাহিত্য পাঠে অনুধাবন করি নিপীড়িত মানুষের প্রতি তাঁর প্রবল ইচ্ছাশক্তি বা জীবনীশক্তি ছিলো,ছিলেন আপন দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে সদা তৎপর। সমাজ সচেতন কবি হিসেবে কথা বলতেন কবিতায়, প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতেন সৃজনী রচনায়। মনে–প্রাণে,নিশ্বাসে-প্রশ্বাসে তিনি কবি ছিলেন বটে তারচেয়ে বেশি ছিলেন একজন মানবিক গুণাবলীসম্পন্ন দায়িত্বশীল মানুষ। এই দায়িত্ব পালন অর্পিত বা আদিষ্ট হয়ে নয়,ছিলো সুবিবেচনাপ্রসূত স্বোপার্জিত। জীবনভর মানুষের মুক্তির সাধক সুফিয়া কামালের জীবনে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে চলেছিলো, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে তাঁর লেখালেখি, সমাজকর্মে কখনো ছেদ পড়েনি। তাঁর যাপিত জীবনে যে অমেয় প্রাণশক্তির পরিচয় নানাভাবে প্রকাশিত হতে দেখি, সেই সৎসাহম, দৃঢ়চেতা মানস বৈদগ্ধ আমাদের মানসিক শক্তিকে প্রেরণা জোগায়,সকল হতাশার মেঘের ফাঁকে আলোর দেখা দেয়। ‘অবিশ্বাসের অন্ধকারের বক্ষ ভেদিয়া উঠিল হাসি’র অর্নিবচনীয় উদ্দীপনা পায় মানসিক অবসাদের ক্লান্ত লগ্নে। কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় বলি, “বিরহ যে ক্ষতি নয়,‘সাঁঝের মায়া’ই তার অনুপম নিদর্শন।” সকল কর্মে ও সৃষ্টিতে তাগিদ দিয়েছেন বাঁচার মতো বাঁচতে, উদ্বুদ্ধ করেছেন দৃঢ়তার সাথে স্বপ্নকে সাথে নিয়ে সকলের জন্য বাঁচতে। যে জীবন তিনি যাপন করে অনন্য ও অমর হয়ে আছেন আমাদের মাঝে। 

 

১৯১১ সালের ২০ জুন বরিশালের শায়েস্তাবাদে এক অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বাবা সৈয়দ আবদুল বারি ছিলেন আইনজীবী। মাত্র সাত বছর বয়সে তিনি পিতৃহারা হন। ১২ বছর বয়সে মামাতো ভাই সৈয়দ নেহাল হোসেনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি তেমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করেননি। তখনকার পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশে বাস করেও স্বচেষ্টায় এবং মায়ের স্নেহ ও পরিচর্যায় স্বশিক্ষিত ও সুশিক্ষিত হন তিনি। নারী আন্দোলন ও সমাজসেবার হাতেখড়ি মাত্র ১৪ বছর বয়সে বরিশালে। ১৯৪৬ সালে কলকাতায় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা শুরু হলে দাঙ্গাপীড়িতদের সহায়তায় এগিয়ে আসেন সুফিয়া কামাল। কলকাতার লেডি ব্রেবোর্ন কলেজের আশ্রয় কেন্দ্রে তিনি কাজ করেন। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পর মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির ‘শান্তি মিছিলে’ তিনি সম্মুখভাগে ছিলেন। দেশের নানান সংকটে, প্রাকৃতিক দুর্বিপাকে সবার আগে পীড়িত প্রাণের পাশে গিয়ে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে দ্বিধা করেননি কখনো।

 

ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধসহ নানা গণতান্ত্রিক আন্দোলনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন তিনি। তাঁর জীবন পরিক্রমায় দেখতে পাই ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে, ১৯৬০-এর দশকের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধেও ছিল তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ। আবার ১৯৭২ থেকে শুরু হওয়া প্রগতিশীল বাংলাদেশ গড়ার আন্দোলনে, ১৯৭৫ থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত অব্যাহতভাবে গণতন্ত্রের বিজয় অর্জনের আন্দোলনেও ছিল তাঁর অপরিসীম ভূমিকা। অর্থাৎ মুক্তিকামী মানুষের আন্দোলনে থেকে এবং নিজের কবিতায়, লেখায় সেই মানুষের কথা লিখেই সুফিয়া কামাল হয়ে উঠেছিলেন ‘জননী সাহসিকা’।

 

ছিলেন ছায়ানট, কচি-কাঁচার মেলা ও মহিলা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রী। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- সাঁঝের মায়া, একাত্তরের ডায়েরী, মোর যাদুদের সমাধি পরে, একালে আমাদের কাল, মায়া কাজল, কেয়ার কাঁটা ইত্যাদি। ১৯৬১ সালে তিনি পাকিস্তান সরকার কর্তৃক জাতীয় পুরস্কার ‘তঘমা-ই-ইমতিয়াজ’ লাভ করেন। কিন্তু ১৯৬৯ সালে বাঙালিদের ওপর অত্যাচারের প্রতিবাদে তিনি তা বর্জন করেন। বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার,একুশে পদক, নাসিরউদ্দীন স্বর্ণপদক, উইমেনস ফেডারেশন ফর ওয়ার্ল্ড পিস ক্রেস্ট, বেগম রোকেয়া পদক, স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ স্বর্ণপদকসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন তিনি।

 

সর্বগ্রাসী পুঁজির বিশ্বায়নকালে গভীরভাবে অনুধাবন করতে পারি,নারীর মুক্তি ও অধিকারকে রাজনীতি এমনকি বিশ্বরাজনীতির সঙ্গে একাকার করে দেখেছেন সুফিয়া কামাল। তবে শিশুরাই পেয়েছে তাঁর কাছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব- প্রাধিকার বা প্রয়োরিটি। সর্বোপরি মানুষের অধিকার বা মানবাধিকারই ছিলো তাঁর জীবনাদর্শের মৌল চেতনা,ভরকেন্দ্র। তিনি এই প্রেরণা পেয়েছিলেন কলকাতায় রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের গভীর সান্নিধ্যে এসে। শুধু রোকেয়ার সান্নিধ্য নয়, সুফিয়া কামালের ব্যক্তিগত জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত ছিল পাহাড় সমান। নারীর মুক্তির জন্য কাজ করার বাসনা তাই তাঁকে চিরকাল তৎপর রেখেছে। তিনি প্রবলভাবেই রাজনীতি সচেতন ছিলেন। পাকিস্তান এবং পরে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সঙ্গে ছিলেন গভীরভাবে যুক্ত। দেশের যেকোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আমৃত্যু সক্রিয় থেকেছেন তিনি। এসবই তাঁকে আরও নতুন নতুন মাত্রায় উপস্থিত করেছে। তাঁর জীবনী ও সৃজনীসৃষ্টির পুন:পাঠ তাঁকে নবরূপে প্রতিষ্ঠিত করে আমাদের চেতনাকে। 

 

আমাদের অনুপ্রেরণার উজ্জ্বল উদাহরণ এই মহান মানুষটি ১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। প্রয়াণদিনে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে প্রতি বছর কবির জন্ম ও প্রয়াণদিন পালনের মাধ্যমে তাঁর জীবন-কর্মের আলেখ্য তরুণ প্রজন্মসহ সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়াস অব্যাহত রাখার দাবি জানাই। 

 

 

লেখকঃ মহুয়া মোহাম্মদ, গণমাধ্যম কর্মী

সব খবর