রাজধানীর বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বর্ণাঢ্য আয়োজনে অমর একুশে বইমেলা-২০২৬-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে তিনি মেলার শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন। উদ্বোধনের পরপরই সর্বসাধারণের জন্য মেলার দ্বার উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।
এবারের বইমেলার মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘বহুমাত্রিক বাংলাদেশ’। উদ্বোধনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বইমেলা কেবল একটি উৎসব নয়; এটি জাতির শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিকাশের সূতিকাগার। তিনি বইমেলাকে ভবিষ্যতে ‘অমর একুশে আন্তর্জাতিক বইমেলা’ হিসেবে বিবেচনার প্রস্তাব দেন, যাতে বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ আরও সম্প্রসারিত হয় এবং বহু ভাষা ও সংস্কৃতি জানার প্রতি নাগরিকদের আগ্রহ বৃদ্ধি পায়।
মেলা চলবে আগামী ১৫ মার্চ পর্যন্ত। প্রতিদিন দুপুর ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা খোলা থাকবে। ছুটির দিনগুলোতে বেলা ১১টা থেকে দর্শনার্থীরা প্রবেশ করতে পারবেন। নিরাপত্তার স্বার্থে রাত সাড়ে ৮টার পর নতুন করে প্রবেশ বন্ধ রাখা হবে। এ বছর মোট ৫৪৯টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ৮১টি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৪৬৮টি প্রতিষ্ঠানকে স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে ইউনিটের সংখ্যা ১ হাজার ১৮টি।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উন্মুক্ত মঞ্চসংলগ্ন গাছতলায় সাজানো হয়েছে ‘লিটল ম্যাগাজিন চত্বর’, যেখানে ৮৭টি স্টল স্থান পেয়েছে। শিশুদের জন্য নির্ধারিত শিশু চত্বরে ৬৩টি প্রতিষ্ঠান অংশ নিচ্ছে। প্রতি শুক্র ও শনিবার বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত থাকবে বিশেষ ‘শিশুপ্রহর’। প্রতিদিন বিকেল ৩টায় মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে বিষয়ভিত্তিক সেমিনার এবং বিকেল ৪টা থেকে শুরু হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
বইমেলাকে কেন্দ্র করে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। মেলা প্রাঙ্গণ ও আশপাশে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
উদ্বোধনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান গ্লোবাল ভিলেজের যুগে মাতৃভাষার পাশাপাশি একাধিক ভাষায় দক্ষতা অর্জন জরুরি। তিনি বাংলা ভাষাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার কথাও জানান। একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন—মেলার পরিসর বাড়লেও গবেষণাধর্মী বইয়ের প্রকাশ ও মানুষের পাঠাভ্যাস কি সমান হারে বাড়ছে?
তিনি বলেন, বিশ্বের ১০২টি দেশের পাঠাভ্যাস নিয়ে এক জরিপে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৭তম। গড়ে একজন বাংলাদেশি বছরে প্রায় তিনটি বই পড়েন এবং বই পড়ার পেছনে সময় দেন মাত্র ৬২ ঘণ্টা। ইন্টারনেটের অতিরিক্ত আসক্তি তরুণদের বই থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে ইন্টারনেটকে পুরোপুরি অস্বীকার না করে তিনি সচেতন ব্যবহারের আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বইমেলা শুধু ফেব্রুয়ারিতে সীমাবদ্ধ না রেখে সারা বছর বিভাগ, জেলা ও উপজেলায় আয়োজন করা যেতে পারে। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেবে বলে তিনি আশ্বাস দেন। উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান এবং মন্ত্রিসভার সদস্যরা।
অনুষ্ঠানের শুরুতে তিনি ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং বলেন, ফ্যাসিবাদমুক্ত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। অমর একুশে বইমেলা সেই লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।