গ্রীষ্মকাল, তাই স্কুল বন্ধ।
বন্ধুরা সব যে যার দেশের বাড়ি।
দুপুর বেলায় খা খা করছে পাড়া।
তিন নম্বর সাইজের একটা ফুটবল নিয়ে গলির ভেতর একা একা হাঁটছে টোকন, মাঝে মাঝে লাথি মেরে পাঠিয়ে দিচ্ছে গলির মাথায়, তারপর দৌড়ে গিয়ে আবার উল্টো লাথি। কিন্তু একা একা আর কতক্ষণ খেলা যায়! তার উপর দুপুর বেলার গনগনে সূর্যটাও জ্বালাচ্ছে ভারি।
দেয়াল টপকে হিমেলদের বাড়িতে চলে গেলে কেমন হয়?
হিমেলদের বাড়িটা বেশ ছায়া ঢাকা, চারিদিকে বড় বড় গাছপালা, মাঝখানে টিনের চালে ছাওয়া সাদা রঙের ছোট্ট একটা বাড়ি। বাড়ির বাইরে পাকা উঠোন। হিমেলরা এখন দিনাজপুরে, মামার বাড়িতে আম কাঁঠালের ছুটি কাটাচ্ছে। হিমেলের মামা এ পাড়ার বাচ্চাদের খুব পছন্দের মানুষ। তিনি যখন দিনাজপুর থেকে ঢাকায় আসেন তখন পাড়ায় রীতিমত হইচই পড়ে যায়। একদিন হয়তো ঘুড়ির মাঞ্জা দেওয়া, আরেকদিন চড়ুইভাতি, পরদিন আবার পাশের গলির সাথে টগবগে ফুটবল ম্যাচ, দেখতে দেখতে কোনদিক দিয়ে যে সপ্তা ফুরিয়ে যায় তা টেরই পাওয়া যায় না। মামার একটা নাম হয়তো ছিল এক কালে, কিন্তু বাচ্চারা সেটা ভুলে গিয়েছে। এখন সবাই তাঁকে ডাকে গদাই মামা। গদাই মামার পাঁচটা পোষা ভূত আছে। ভুতেদের নাম- গদাই, মাখন, খলিলুল্লাহ, খইমন, আর রতন। এই পাঁচটা ভূতকে তিনি আটকে রেখেছেন কাঁচের বোতলে। গদাইটা তাঁর সবচে প্রিয়।
হিমেলদের বাড়ির দেয়ালটা অনেক উঁচু। শুধু উঁচু হলে টোকনের অত ভাবনা ছিল না। জামান খালু, মানে হিমেলের বাবা লোহার পেরেক পুঁতে রেখেছেন যাতে দেয়াল টপকে কেউ গাছের ফল নিয়ে যেতে না পারে। ক্লাস সেভেনের সোহাগ একবার চেষ্টা করতে গিয়ে পায়ে কাঁটা বিঁধিয়ে ফেলেছিলো। দুই পরিবার কথা বলেনি তিনমাস।
নাহ, দেয়াল টপকে কাজ নেই। বরং লাট্টু ঘোরানো যাক। প্যান্টের পকেট থেকে লাট্টুটা বের করতেই টোকনের মনে পড়লো লেত্তিটা কাল ছিঁড়ে গিয়েছে। এক একটা লেত্তির দাম পাঁচ সিকা করে। অথচ কী কপাল টোকনের! শেষ আধুলিটা দিয়ে আজ সকালেই ও মাযহার ভাইয়ের দোকান থেকে আণ্ডা আইসক্রিম মালাই কিনে খেয়েছে। আণ্ডা আইসক্রিম দারুণ মজার, মাযহার ভাই বরফ কুচিতে ঠাসা মাটির একটা কলসির ভেতর ছোট ছোট প্লাস্টিকের ছাঁচে ভরে রাখেন। চাঁচের মাঝ বরাবর ছুরি দিয়ে চাপ দিতেই ম্যাজিকের মত বেরিয়ে আসে নারকেলের কুঁচি ঠাসা আইসক্রিম মালাই। দেখতে ডিমের মতো, তাই নাম আণ্ডা আইসক্রিম। কিন্তু যতই মজা হোক, আধুলিটার জন্য টোকনের খুব দুঃখ হচ্ছে এখন। ছেঁড়া লেত্তি দিয়ে কি আর মনের মতো লাট্টু ঘোরানো যায়! মনের দুঃখে গজগজ করতে করতেই লেত্তি পেঁচিয়ে লাট্টু ছুড়ল সে, আর তা ফসকে গিয়ে লাগলো হিমেলদের বাড়ির গেটে। কুড়িয়ে আনতে গিয়ে দেখে হিমেলদের গেটে তালা দেয়া নেই। ওরা নিশ্চয়ই ফিরে এসেছে।
হাত দিয়ে হালকা চাপ দিতেই ভীষণ বিচ্ছিরি একটা ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ করে গেটটা খুলে গেলো। উঠোন ময় ছড়িয়ে আছে রাশিরাশি পাতা। হিমেলের মা’র ভীষণ শুচিবাই, বাড়ির ভেতর-বাইরে পরিষ্কার করতে করতেই তাঁর দিন চলে যায়। তার মানে ওরা এখনও ফেরেনি। ফেরেনি ভালোই হয়েছে। আমগাছে ঝুলতে থাকা টসটসে আমগুলোর দিকে তাকিয়ে আধুলির শোক ভুলে গিয়েছে টোকন। আলতো করে গেটটা ভিড়িয়ে দিয়ে গাছের দিকে পা বাড়াতেই কুচকুচে কালো একটা বেড়াল, যেন আকাশ থেকে নেমে এসে, ঘাড়ের রোম ফুলিয়ে হিসিয়ে উঠলো। টোকন পড়িমরি করে উল্টোদিকে দৌড় লাগাতেই গাছের মগডাল থেকে গদাই মামা ডেকে উঠলেন,
“কিরে টোকন কোথায় যাস?”
গদাই মামা মারা গিয়েছেন গত বর্ষায়। আম পাড়তে গাছে উঠার পর কেমন করে যেন পা পিছলে পড়ে গিয়েছিলেন। সেই ঘটনার মাসখানেক পর একদিন; সন্ধ্যে বেলায় জামান খালু উঠোনে বসে চা খাচ্ছেন, দুটো চুমুক দিয়ে চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে পায়ের উপর পা তুলতে গিয়েই দেখেন গদাই মামা সামনে দাঁড়িয়ে। পরবর্তী অংশটা খালাম্মার কাছে শুনতে শুনতে সবার মুখস্ত হয়ে গিয়েছে। জামান খালু অভ্যাস মতো বলেছিলেন,
“কিরে, কখন এলি?’
জামান খালুর মনেই ছিলোনা গেলো মাসের দুর্ঘটনার কথা।
“এই এলাম দুলাভাই।”
“নাকিয়ে নাকিয়ে কথা বলছিস যে, ঠাণ্ডা লেগেছে নাকি?”
“হি হি হি, কী যে বলেন দুলাভাই! নতুন করে আবার ঠাণ্ডা, হা হা হা। যেখানে থাকি সেখানে তো ঠাণ্ডাই।”
“দিনাজপুরে খুব ঠাণ্ডা পড়ে বটে! ঢাকায় তো আজকাল সারা বছর একটাই সিজন। তেমন ঠাণ্ডা এখানে আর পড়ে কই?”
“সে জন্যেই তো চলে এলাম। হাওয়া বদল আর কি। আপনার চা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে দুলাভাই। আমি বরং ভেতরে যাই, আপনি চা শেষ করেন।”
“আচ্ছা যা, পরে তোর সাথে কথা বলবো।”
মামার দিকে না তাকিয়েই চায়ের কাপটা তুলে নিয়ে আয়েশ করে একটা চুমুক দিয়েছিলেন জামান খালু। তারপর আকাশ পাতাল কাঁপিয়ে একটা বেজায় চিৎকার!
“কোথায় গেলো উল্লুকটা? নাজমা, এই নাজমা? হারামজাদাকে কান ধরে আমার সামনে নিয়ে আসো।”
নাজমা খালা তখন কোমরে আচল গুঁজে দেয়ালের গায়ে লেগে থাকা কাকের ইয়ে পরিষ্কার করছিলেন। খালুর চিৎকার শুনে গজ গজ করতে করতে এসে জিগ্যেস করলেন,
“বলি, এই সন্ধ্যে বেলায় অমন চেঁচাচ্ছ কেন?”
“চেঁচাবো না তো কি আহ্লাদ করবো? আমার চায়ের কাপে এক গাদা চিরতা ঢেলে দিয়ে গিয়েছে।”
জামান খালু আর গদাই মামার ঠাট্টার সম্পর্ক। খালু যদিও খুব রাশভারী, গদাই মামা সেই সম্পর্কের ব্যাপারে বেশ সচেতন।
“কার কথা বলছ?”
“কার আবার, তোমার সেই গুণধর ভাই।”
বলতে বলতেই জামান খালুর মনে পড়ে গেলো গদাই মামা বেঁচে নেই। তারপর আগেরবারের চেয়েও আরও অনেক জোরে একটা চিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারালেন তিনি।
সেই রাতে পাড়ার সবাই এসে জড়ো হয়েছিলো হিমেলদের বাসায়। সে এক দৃশ্য! জামান খালুকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে স্যালাইন পুশ করে চলে গিয়েছেন পাড়ার ডাক্তার সুরেশ কাকা। অজ্ঞান জামান খালুকে সুরেশ কাকা ঘুমের ওষুধ কেন খাওয়ালেন এই নিয়ে দারুণ তর্ক জুড়ে দিয়েছেন পাড়ার বড়রা। মুন্নার বাবা, মানে টোকনদের স্কুলের হুজুর স্যার, হারিকেন হাতে বাড়ির চারিদিকে ঘুরে ঘুরে বিড়বিড় করে কী যেন বলছেন। পেছন পেছন হাতুড়ি আর গজাল হাতে তাঁর তালেবে এলেম। গজাল পুতে বাড়ি বন্ধ করা চলছে। হারিকেনের সেই আলো আঁধারিতে পাড়ার বাচ্চারা হইচই করে টিলো এক্সপ্রেস খেলছে, গদাই মামা ফিরে আসায় তাঁদের আনন্দের আর সীমা নেই।
হুজুর স্যারের গজাল কোনো কাজে লাগেনি। গদাই মামা এখানেই থেকে গিয়েছেন পাকাপাকি ভাবে। আমগাছটার মগডালে তাঁর বাসা, সে বাসা অবশ্য কেউ দেখতে পায় না। প্রথম প্রথম ভয় পেলেও পাড়ার লোকেদের এখন সয়ে গিয়েছে। খালাম্মাও মেনে নিয়েছেন ভূতপূর্ব ভাইয়ের ভুতাবস্থা। বাজার থেকে মাছ এলে, আঁশটা-মুড়োটা মামার জন্যই তোলা থাকে। কেবল জামান খালু চিড়বিড় করেন রাগে। গদাই মামার সাথে তাঁর ঠাট্টার সম্পর্ক। সম্পর্কের সে দাবীটা মামা এখনও ভোলেননি, নিত্যনতুন ভৌতুকে অতিস্ট করে রেখেছেন তাঁকে।
বেড়ালের খ্যাঁকানিতে ভয় পেয়ে পালিয়ে যেতে যেতে গদাই মামার গলা শুনে ঘুরে দাঁড়িয়ে টোকন বলল,
“বাসায় চলে যাচ্ছিলাম গদাই মামা, হিমেলরা এখনো ফেরেনি কিনা…”
“আম খেতে এসেছিলি তাইনা?”
মামার কাছে লুকিয়ে আর কী হবে! টোকন মিনমিন করে বলল,
“দাও না মামা কয়েকটা পেড়ে। খালু তো আর এখানে নেই।”
“ওরে না থাকলেই কি শান্তি আছে? যাবার আগে গুনে রেখে গিয়েছেন, সবসুদ্ধ দু’শ তিরাশিটা আছে, আমাকে বলেছেন পাহারা দিতে। তবে কি জানিস? আজকে বাতাসটা খুব জোরে বইছে। এক দুটো আম পড়ে যেতেই পারে।”
খুশিতে দাঁত বের হয়ে গেল টোকনের। মামাটা যে কী ভালো! আমের জন্য হাত বাড়িয়ে সে প্রশ্ন করলো,
“আচ্ছা মামা, তুমি গাছ থেকে পড়ে গিয়েছিলে কেমন করে?”
“পড়ে যাইনি তো! খইমন আমাকে ফেলে দিয়েছিলো।”
“বলো কী! খইমন না তোমার পোষা ভূত?”
“গর্জনও তো দুলাভাইয়ের পোষা, তাই বলে কি তাঁকে কামড়ে দেয়নি?”
“গর্জনের কথা বাদ দাও মামা। কোথায় কুকুর আর কোথায় ভূত!”
“কুকুরে আর ভূতে কোনো পার্থক্য নেই, বুঝলি? দুটাই কামড়ায় যখন পাগল হয়ে যায়। খইমনটা এমনিতে ভালোই ছিলো, মাঝে মাঝে এক আধটু যন্ত্রণা করলেও আমার কথা অমান্য করতো না।”
“কোথায় পেয়েছিলে ওকে?”
“খালিশপুরের বিলে মাছ ধরতে গিয়ে। দিনাজপুরে আমাদের যে বাড়ি, তার একটু দুরেই খালিশপুরের বিল। আশেপাশে পাঁচ ছয় মাইলের মধ্যে বাড়িঘর কিছু নেই, বর্ষাকালে এক পাড়ে দাঁড়ালে আরেক পাড় দেখা যায়না, চারিদিকে কেবল পানি আর পানি। ভরা পূর্ণিমায় খাবার দাবার আর ছিপ নিয়ে বন্ধুরা বেরিয়ে পড়তাম, মাছ ধরাটা ছিল বাহানা, নৌকায় করে খালিশপুরে ঘুরে বেড়ানোটাই ছিলো আসল মজা।”
“নৌকায় করে ঘুরে বেড়াতে আমারও ভালো লাগে। ঢাকায় তো নৌকা নেই, নানা বাড়ি গেলে তখন খুব করে নৌকায় ঘুরি।”
“এ তো ভারি যন্ত্রণা হল, বলি গল্পটা তুই বলবি না আমি? কথার মধ্যে ভ্যাজর ভ্যাজর করবি না।”
“আর করবো না মামা।”
“সেবার গ্রামে বসন্ত হয়েছিলো খুব, আমার বন্ধুদের সবাই ঘরে বসে কোঁকাচ্ছে, খালিশপুরে যাবার মতো কেউ নেই, শেষমেষ একাই রওনা হলাম। পৌঁছুতে পৌঁছুতে সূর্য প্রায় ডোবে ডোবে। ঘাটে তখন নৌকা বলতে একটাই, মাঝি কোথায় গিয়েছে কে জানে! কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে খাবারের পোটলা আর ছিপ গুলো নৌকায় তুলতে তুলতে একটা শব্দ শুনে পেছন ফিরে দেখি খইমন দাঁড়িয়ে।”
“খইমন দাঁড়িয়ে মানে?”
“আমাদের পাশের গ্রামের ছেলে। বয়স ধর এই তেরো কি চোদ্দ। বাপ-মা নেই, কাকাদের সাথে থাকে। সারাদিন বনে বাদাড়ে ঘুরে বেড়ায়, আজকে এর গাছের ফল, কালকে ওর খেতের শসা, পরশু তার পুকুরের মাছ - খইমনের দস্যিগিরির কোনো শেষ নেই। ওকে দেখে তাই অবাক হলাম না। সে নাকি খবর পেয়েছে আমি মাছ ধরতে একাই খালিশপুরে যাচ্ছি, তারও খুব মাছের শখ তাই আমার পেছন পেছন চলে এসেছে। খালিশপুরের মাছেরা বুঝলি, খুব চালাক! সহজে ধরা দিতে চায় না। অথচ সে রাতে, বললে বিশ্বাস করবিনা, মাছ ধরে যেন আর কুলিয়ে উঠতে পারছিলাম না। শেষমেশ ছিপ গুটিয়ে ঘাটের সাথে নৌকা বেঁধে ঘুমিয়ে পড়লাম। রাত করে নৌকা বেয়ে বাড়ি ফিরে কাজ নেই। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি খইমন উধাও। নৌকার খোলে জমিয়ে রাখা মাছগুলোও হাওয়া। ব্যাটা চোরের বাচ্চা চোর! আমার সারা রাতের পরিশ্রম সাফ করে পালিয়েছে।”
“একটা কথা বলবো মামা?”
“আহ, গল্পের মধ্যে বাগড়া দিবি নাতো!”
“আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি বলো।”
“খইমনদের বাড়িটা আমার ফেরার পথেই, ভাবলাম ওর কাকাকে বলে দু’চার ঘা’র বন্দোবস্ত করে যাই। সেই সাথে মাছ গুলোও ফিরিয়ে নেওয়া যাবে। বাড়ির কাছাকাছি যেতেই চোখে পড়লো সামনে অনেক মানুষের জটলা। ভিড় ঠেলে উঠোনে ঢুকে দেখি শম্ভু ওঝা মুখ ভার করে বসে আছে। তার পায়ের কাছেই একটা মাদুরে শুয়ে খইমন। আমি মুখ খোলার আগেই খইমনের কাকা আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউ মাউ করে কেঁদে উঠলো। খইমনকে কাল সকালে সাপে কেটেছে। শম্ভু ওঝার আসতে আসতে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিলো, সারারাত চেষ্টা করেও বিষ নামানো যায়নি। আমার অবস্থা তখন তোর জামান খালুর মতো। কেবল একবার বিড়বিড় করে বললাম, সে কি করে হয়? খইমন তো সারা রাত আমার সাথে খালিশপুরে মাছ ধরে বেড়িয়েছে! তারপর মাথা ঘুরে পড়ে গেলাম।”
“তারপর! তারপর কী হলো মামা?”
“কী আর? খইমনকে গোর দিয়ে ফিরে এসে শম্ভু পড়লো আমাকে নিয়ে। তিনদিন তিন রাত পরে আমার হুঁশ ফিরেছিলো। হুশ ফিরে দেখি ঘুটঘুটে রাত, আমার বিছানার পাশে গালে হাত দিয়ে বসে খইমন। আমি একটা চিৎকার দিয়ে আবার জ্ঞান হারালাম। একমাস এইই চলল আমার, জ্ঞান আসে, জ্ঞান যায়, যায়না কেবল খইমন। তার নাকি খুব মাছ খাবার শখ, যে সে মাছ নয়, খালিশপুরের বিলের মাছ। শেষমেশ ভাবলাম খইমন সাথে থাকলে তো ভালোই, কেমন শ্রাবণ মাসে ধানক্ষেতে খলবল করতে থাকা কইয়ের ঝাঁকের মতো ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ চলে আসে! একটাই মুশকিল, নদীর খোলা বাতাসে খইমনের নাকি ঠাণ্ডা লাগে খুব। বুদ্ধি করে ওকে একটা বোতলের মধ্যে রেখে দিলাম। গদাই, মাখন, খলিলুল্লাহ, আর রতনকে ওই খইমনই জুটিয়ে এনেছে। ওরাও থাকতো সেই বোতলে।”
ঢাউস ঢাউস দুটো আম খেয়ে টোকনের পেট ভরে গিয়েছে। কিন্তু আমগুলো এতো মিষ্টি! আরেকটার জন্য হাত বাড়িয়ে সে জিজ্ঞেস করলো,
“কিন্তু মামা খইমন তোমাকে ফেলে দিলো কেন?”
“গদাইটা ছিলো বয়সে এদের মধ্যে সবচেয়ে ছোটো। যখন পাই তখন ঠাণ্ডা লেগে ওর একেবারে যা তা অবস্থা, সারাক্ষণই নাকের নিচে সিকনি ঝুলে থাকে। ছোটো বলেই কিনা, নাকি খুব রোগা বলে, ওর উপর মায়াটা আমার একটু বেশিই ছিলো। খালিশপুরের বিলে যেদিন মহাশোল ধরা পড়তো, মুড়োটা গদাইকেই দিতাম। অন্যেরা লেজ আর আঁশ পেলেই খুশি, কেবল খইমন খুব গাইগুই করতো। গত বর্ষায় দুলাভাই এর জন্য খালিশপুরের একটা মহাশোল নিয়ে এসেছিলাম। দুলাভাইয়ের আবার মুড়ো খুব পছন্দ। আমি আপাকে লুকিয়ে লেজ আর আঁশগুলো নিয়ে আমগাছের একটা ডালে এসে বসেছিলাম ভুতেদের খাওয়াবো বলে। গদাইকে একটু দিতেই খইমন রেগে গিয়ে বললো, মুড়োটাতো সবসময় ও খায় এখন আঁশ দিতে হবে কেন? তারপর এক কথা দুই কথা, হঠাৎ আমি বুঝে ওঠার আগেই দিলো ধাক্কা। দিয়েই ঝুপ করে ঢুকে পড়লো আমার হাতে ধরা বোতলের ভেতর, সংগে অনন্যারাও। আমি ডাল ধরবো না ছিপি লাগাবো ভাবতে ভাবতে ছিপিটাই লাগালাম। হঠাৎ মনে হলো শরীরটা কেমন যেন হালকা হয়ে গিয়েছে। আমি উড়ছি।”
“হু, নাজমা খালাম্মা অনেক কেঁদেছিলেন সেদিন। তোমার সেই বোতল এখন কোথায় গদাই মামা?”
“জানিনা রে, আপা নিশ্চয়ই ফেলে দিয়েছে। দিনের মধ্যে চোদ্দবার উঠান ঝাড়ু না দিলে তো আপার শান্তি হয় না। আচ্ছা, তোর কাছে কি ভালো কোন বোতল আছে? আমগাছে অনেক ঠাণ্ডা, বুঝলি। কাশিটা যেতে যেতেও আর যাচ্ছে না।”
“কোকের বোতল হলে চলবে?”
“ধুর, কোকের গন্ধ আমার একদম ভালো লাগে না। কড লিভার অয়েলের বোতল নেই? কী সুন্দর মাছ মাছ গন্ধ! একেবারে যেন খালিশপুরের মহাশোল।”
“চিন্তা কোরোনা মামা, বোতল পেলে তোমাকে জানাবো। এখন তাহলে যাই, বাবা অফিস থেকে এলেন বলে! সময় মতো ফিরতে না পারলে পিটিয়ে সিধে করে ফেলবেন আমাকে।”
বাড়ি ফিরে টোকন দেখলো ওর নানা এসেছেন। পরদিন সবাই মিলে হই হই করতে করতে নানাবাড়ি চলে গেল ওরা।
একমাস খুব করে আম কাঁঠাল খেয়ে টোকনরা যখন ঢাকায় ফিরল, হিমেলদের বাড়িটা তখন আর নেই। নেই মানে নেই, ঘর-দোর-উঠোন-গাছপালা কিছুই নেই। সব কিছু বিক্রি করে দিয়ে হিমেলরা চলে গিয়েছে অন্য কোথাও। এখানে নাকি পাঁচ তলা একটা বাড়ি উঠবে।