১.
হিসেব করলে গুনে গুনে চল্লিশ বছর হয়ে গেল তাকে আমি চিনি। ১৯৮৬ সালে প্রথম তাঁকে দেখি চারুকলায়। আমার সেজ মামা ইকবাল আহমেদ তপু তখন আর্ট কলেজে পড়তেন। তিনি ছিলেন তপু মামার ব্যাচমেট। আমি এসএসসি পাশ করে সিটি কলেজে ভর্তি হয়েছি- কিন্তু মনের ভেতর সুপ্ত ইচ্ছে আর্ট কলেজে পড়ে শিল্পী হবো। আমার স্কুল ছিল নারিন্দা সরকারি স্কুল। স্কুলের একপাশে খ্রিস্টান কবরস্থান আর আরেকপাশে মেথরপট্টি।
স্কুলে পড়ার সময় সুভাস দত্তের ‘বসুন্ধরা’ সিনেমা দেখেছিলাম। তখনও জানতাম না যে সিনেমার নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের বাসা ওয়ারির টিপু সুলতান রোডে। একদিন স্কুল থেকে ফেরার পিথে বিকেলে দেখি বসুন্ধরা সিনেমার নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন দোতলা এক বাড়ির গেট দিয়ে বেরিয়ে রিকশার জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন। আমার জীবনে সেই প্রথম নায়ক দেখা। তখন থেকে মনে হালকা পাতলা শখ জেগেছিল যদি আঁকিয়ে হওয়া যায়! আমার আর কি দোষ! ঐ বয়সে একটু আধটু আর্টিস্ট হওয়ার ইচ্ছে মনে ‘চাগাড়’ দিতেই পারে৷
২.
এসএসসি পাস করে সিটি কলেজে ভর্তি হয়ে গেলাম। কলেজে মাতিয়া বানু শুকুকে পেলাম। এর ফাঁকে ফাঁকে চারুকলায় ভর্তির জন্য কোচিংও করি। আমার সাথে কোচিং করে দেওয়ান মিজান, ফরিদ, মাহবুব, শিপু, হানিফসহ অনেকে। ফিগার আঁকি, নকশা আঁকি। নকশা, রিটেনে টিকে গেলাম। ভাইবায় আমাকে আর কে আটকায়। কিন্তু ভাইবায় আশা ভঙ্গ হলো আমার। চান্স পেলাম না। ততদিনে সকাল বিকেল চারুকলায় যেতে যেতে কখন যে নিজেকে ওখানকার একজন ভাবা শুরু করেছিলাম বুঝতে পারিনি। আমার সেজ মামা যেহেতু আগে থেকেই চারুকলায় পড়ে সুতরাং আমি সেই সুযোগের অপব্যবহার করা শুরু করলাম।
প্রায় সময়ই সিটি কলেজে ক্লাস ফাকি দিয়ে চলে যেতাম চারুকলায়। আমার সঙ্গে যারা কোচিং করত তারা তো চান্স পেয়েছে- সেই সুযোগটাও আমি শতভাগ কাজে লাগাই। সিটি কলেজের ক্লাস ফেলে আমি আড্ডা দিতে চলে যাই সেখানে। মামার বন্ধুরা আমার বন্ধু হয়ে যায়। আমি তাদের সঙ্গে সকাল দুপুর বিকেল আড্ডা মারি, গল্প করি, টেবিল টেনিস খেলি, পুকুরের পেছনের মাঠে ক্রিকেট খেলি। দুপুরের পর শাহবাগ থানার পেছনে জঙ্গলের ভেতর মোল্লা নামের একজন একটা দোকান চালাতেন। মোল্লার দোকানে চা, বিস্কুট, পরোটা, ডালভাজি, ডিম পাওয়া যেত। চারুকলার ছেলেমেয়েরা মোল্লার দোকানে সকাল থেকে অনেক রাত অবধি আডডা দিত। খাওয়াদাওয়া করত। দুপুরে ভাত আর ডিমের তরকারিও পাওয়া যেত। আমরা সেখানে নাস্তা করি। গল্প করি।
'৯২ সালের দিকে মোল্লার দোকানটি বন্ধ হয়ে যায়। সেসময় এক ছাত্র জলরঙে মোল্লার ছবি একে দোকানের ভেতর ঝুলিয়ে রেখেছিল। পাঞ্জাবি- পাজামা, গায়ের কালার আর লম্বা দাড়িতে মোল্লার সুরতে খানিকটা রবীন্দ্রনাথের অবয়ব এসে পড়ত যে কারণে কেউ কেউ তাকে রসিকতা করে মোল্লানাথ বলে ডাকত। তাছাড়া মোল্লা একটু বাউল স্বভাবেরও ছিল। অনেক সময় মোল্লার দোকানে চারুকলার ছেলেমেয়েরা ভাত খেয়ে, ডিম পরোটা খেয়ে বিল না দিয়ে মোল্লাকে বিলটা খাতায় লিখে রাখতে বলত। মোল্লা কিছু না বলে লিখে রাখত। বাকির খাতার হিসেব পাবে না জেনেও মোল্লা দিনের পর দিন তাদের খাবার দিয়েছে। এক অদ্ভুত মানুষ ছিল মোল্লা! মোল্লার দোকান উঠে যাবার অনেক পরে সেখানে গড়ে উঠেছিল ছবির হাট।
৩.
সেই তখন থেকে ধ্রুব এষকে চিনি। পাট খড়ির মতো ঢ্যাঙা লম্বা একমানুষ। মামার বন্ধুদের সবাইকে আমি মামা বলে সম্বোধন করতাম। তাকেও মামা বলতাম। এরপর কিভাবে কিভাবে যেন এই মানুষটা আমার আপন মামার চেয়েও আপন মামা হয়ে গেলেন।

৪.
বাংলা প্রচ্ছদে ধ্রুব এষকে বলা হয় সুররিয়ালিজমের প্রবর্তক, সালভাদর দালি – কেউ কেউ আবার তাঁকে বলেন বর্তমান বাংলা প্রচ্ছদের একচ্ছত্র অধিপতি। পৃথিবীতে যে যেভাবে বলুক না কেন ধ্রুব এষ গত তিন দশকে তাঁর নিত্য নতুন, বহুমাত্রিক প্রচ্ছদ দিয়ে সত্যি সত্যিই একটি ঘোরের সৃষ্টি করেছেন। এক হাতে ধ্রুবর মত এত প্রচ্ছদ এ পৃথিবীতে এযাবৎ আর কেউ করেন নি। তাঁর করা প্রচ্ছদ দেখলে মন প্রসন্ন হয়, হৃদয় স্ফীত হয়। আর কি হয়? আর একটা জিনিস হয়- বুকের ভেতর এমায়ার জগতের যে নানা আলো আছে, রহস্য আছে, ছল আছে- সেসব খেলা করে। এসব করে করে ধ্রুব এষ নির্বিকারভাবে আমাদের মধ্যে এক অদ্ভুত ঘোর তৈরি করেছেন। প্রায় তিরিশ হাজার প্রচ্ছদ এঁকেছেন এই শিল্পী। সম্ভবত তাঁর চেয়ে বেশি প্রচ্ছদ আর কেউ আঁকেন নি।
শুধু কি ছয়- নয় ইঞ্চির প্রচ্ছদ তৈরি করেন ধ্রুব এষ!
না, দুই হাতে দশ হাতেরও অধিক কাজ আর কাজের ঘের রচনা করেন এই শিল্পী। কি গল্প, কি ছড়া, কি সায়েন্স ফিকশন, কি অতিপ্রাকৃত উপন্যাস, রহস্য গল্প, কি রূপকথা আর কি কি বলা যায়! ধ্রুব এষকে নিয়ে চারদিকে যে বিস্ময়ের ছাউনি সেটা সে একদিনে তৈরি করে নি- অনেকদিন ধরে যতন করে তৈরি করেছে। ছবি আঁকার সময় সে ধ্যানী, গল্প লেখার সময় সে ধ্যানী, আড্ডা দেয়ার সময় মহা আড্ডাবাজ, সিনেমা দেখার সময় তার চেয়েও অধিক ধ্যানী। প্রচুর সিনেমা দেখে সে- রাজ্যের সিনেমা তার কালেকশনে। তাঁর ঢেরায় গেলে দেখাবে সব। বলতে গেলে সে সিনেমার দুর্দান্ত পোকা।
৫.
ধ্রুবকে চিনি, জানি আর মানি। এই শহরে সে আমার পরম আত্মীয়। আমার ছেলেমেয়ের অতি আদরের নানাভাই সে। আমি সব সময় তাঁকে মহাত্মা বলে ডাকি। তিনি আমার কাছে মস্ত এক মহাত্মা। ঢাকা শহরে আত্মীয় অনাত্মীয় মিলে অনেক স্বজন থাকা সত্ত্বেও ধ্রুব এষকে আমি খুব ‘বালা পাই’। সিলেট অঞ্চলে ‘বালা পাই’র মানে হলো আমি তারে ভালোবাসি। আমি আমার বউ, ছেলেমেয়ের পর তাইনরেই বেশি বালা পাই।