সর্বশেষ

নকশ-ই-পরী

প্রকাশিত: ২৩ মার্চ ২০২৬, ১৯:১৮
নকশ-ই-পরী

১.

দুখত রহমত বানোর সমীপে সাক্ষাতে যেতে বুক ধড়ফর করছে ভাই নাথের। অবশ্য নবাবজাদী পর্দার আড়াল থেকেই কথা বলবেন। কিন্তু এই বঙ্গাল মুল্লুকের সবচেয়ে জায়েদা শহর জাহাঙ্গীর নগরে এসে অব্দি সে শুনছে যে নবাবজাদী দুখত ওরফে পরী বিবি নাকি খোদ মোগল বাদশাহ শাহজাহানের স্ত্রী মুমতাজ মহলের আপন ভাই আসফ খানের নাতনী। আসফ খানের ছেলে শায়েস্তা খানই এখন ঢাকার নবাব বটে! তাঁর আসল নাম অবশ্য মির্জা আবু তালিব। ‘শায়েস্তা খান’ ত’ মোগলদের পক্ষ হয়ে প্রদেশগুলো শাসন করার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের একটি দাপ্তরিক পদবি মাত্র- যদিও অবুঝ বাঙ্গাল একটা সময় তাঁর এই দাপ্তরিক পদবিকেই ‘নাম’ মনে করবে। এহেন মির্জা আবু তালিব বা সুবা বাংলার শাসন কর্তা শায়েস্তা খানের কন্যা পরী বিবি সেই মুমতাজ মহলের রূপের ছটাই পেয়েছে বলে লোকে বলে।

 

তবে, জাহাঙ্গীর নগরের মানুষের কাছে পরী বিবির নাম-ধাম তাঁর রূপের জন্য বা নবাবজাদী হবার জন্যও নয়। এই শহরের যত ভাল ভাল মকান বলো, মসজিদ বা দরগা বলো- সব কিছুর নক্সা ঐ পরী বানুর হাতেই হয়! এমনকি নবাবজাদীর নাকি সামনে তার মোগল শাহজাদা মোহাম্মদ আজম শাহের সাথে যে শাদি হবে, সেসব নিয়েও কোন হুঁশ নেই। শাদির আগে মেয়েরা রূপ আরো খোলতাই করার জন্য কত কী করে! অথচ দুখত বানো পড়ে আছে তাঁর যত মকানের নক্সা নিয়ে। তামাম দিন সে খাতা-পেন্সিল, রং-তুলি নিয়ে পড়ে থাকে। নক্সা করার কাজ শায়েস্তা কন্যা শিখেছে পিতার কাছেই। দুনিয়াদারির চাকরিতে ঢোকার আগে শায়েস্তা খানের প্রিয় কাজ ছিল বিভিন্ন দর-দালানের নক্সা করা। পিতার বয়স বা ব্যস্ততা, যে কোন কারণেই হোক, শহরে কোন বড় মকান, মসজিদ-মন্দির-দরগাহ স্থাপণের আগে নবাবজাদির সাথে সবাইকে সেসব নতুন ভবনের নক্সার জন্য প্রায়ই নানা বৈঠকেও বসতে হয়। 

 

কিন্ত এমন কথা জীবনে শোনে নি ভাই নাথ। পাঞ্জাবের অমৃতসরে গুরু নানক যে নয়া ধর্ম তাদের দিয়ে গেছেন, সেখানে জাত-পাতের বিরুদ্ধে কথা বলা হলেও নারী কিন্তু নারীই থাকে। আওরতের কাম ত’ ঠিকঠাক বয়সে বিয়ে হওয়া, নান্না-মুন্নী যত বাচ্চা-কাচ্চার জন্ম দান, লালন পালন, ঘর-সংসারের কাজ-কর্ম করা! অবশ্য মোগল বাদশাহদের ঘরের মেয়েরা কী আর সাধারণ ঘরের মেয়েদের মত হবে? সে জাহান আরা বলো, রওশন আরা বলো কী জেব-উন্নিসা বলো! বাদশাহজাদীরা শায়েরি লেখা আর তসবীর আঁকায় যত মন দিয়েছেন, ঘর-সংসার কে আর তত করলেন বা করতে পারলেন?

 

 

এই জাহাঙ্গীর নগরে ভাই নাথ অবশ্য এসেছেন একটি বিশেষ কাজে। বড় পূণ্যময় সেই কাজ। গুরু নানক আজ থেকে শ’ খানেক বছর আগে এই জাহাঙ্গীর নগরে নাকি এসেছিলেন। মিথিলা (বিহার), কান্ত নগর (দিনাজপুর), কামরূপ (আসাম) আর সিলেট হয়ে পূর্ব বাংলার জাহাঙ্গীরনগরে এসে নাকি কিছুদিন তিনি ছিলেনও। তারপর এখান থেকে চলে যান চট্টগ্রাম আর সুতানুটি-গোবিন্দপুর-কলকাতা হয়ে উড়িষ্যার জগন্নাথ ধামে। গুরু নানক এই শহরের ঢাকেশ্বরী মন্দিরে ভি গেছিলেন। গুরু নানকজি আজকের নবাব শায়েস্তার এই শহরে অবশ্য এসেছিলেন জলপথে। নৌকা করে। আর তাঁর নৌকা নোঙ্গর ফেলেছিল এই শহরের উত্তরে শিবপুর গ্রামে। 

 

‘ভাই নাথ- তোমাকে জাহাঙ্গীর নগরে একবার যেতে হবে। বঙ্গাল মুল্লুকে বা সুবে বাংলার বড় শহরটায়। মোগলরাই শাসন করছে। শায়েস্তা খান ওখানে নবাব। গুরু নানকজি ঐ শহরে শ’খানেক বছর আগে ছিলেন। তাঁর স্মৃতিগুলো ঐ মুল্লুক থেকে যাতে হারিয়ে না যায়, তা’ দেখা আমাদের সবার দায়িত্ব,’ অমৃতসরের তখত সাহিবে বসে বলেন বর্তমানের প্রধান শিখ গুরু গুরদিত্য।

 

‘জ্বি- আপনি বললে অবশ্যই যাব। কিন্তু, ইতোমধ্যেই সেখানে ত’ উদাসী আলমাস্ত আপনার নির্দেশে গেছেন, তাই না?’

‘হ্যাঁ। আর উদাসী আলমাস্ত ঐ শহরে কয়েক মাস অনেক খোঁজা-খুঁজির পর আমাকে চিঠি পাঠিয়েছে যে ঐ শহরের সুজাতপুর মৌজা নামে একটি জায়গা সে খুঁজে পেয়েছে যেখানে গুরু নানকজি ছিলেন। সে ওখানে একটি ‘মঞ্জি’ও স্থাপণ করেছে।’

‘শুভ সংবাদ। এখন আমাকে কী করতে হবে?’ 

 

‘বহু দীর্ঘ পত্র আমাকে লিখেছে উদাসী আলমাস্ত। গুরু নানকজী আজকের জাহাঙ্গীর নগরে পৌঁছেছিলেন জলপথে- নৌকায়। তখন আবার জায়গাটিকে নাকি ডাকা হতো ‘শিবপুর’ নামে। তখন সেখানে ছিল বড়িয়া সব ফেরী ঘাট, পোতাশ্রয়, গুদামঘর আর লেকিন একটি ছোটা বাজার। কিন্তু চারপাশে পিয়াস লাগলে একটু ভাল পানির কোন আস্তানা ছিল না। কাজেই লোকজন খরা-শুখায় কি পেটের বিমারীতে প্রায়ই মারা যেত। শিবপুরের পাশেই জাফরাবাদ গ্রামে গুরুজি তাই একটি কূয়া খনন করেছিলেন। আশপাশের গরীব-দু:খী সব তখন ওনার ভক্ত হয়ে গেলো। মোগলদের আজকের জাহাঙ্গীরনগর শহরে গিয়ে তাই গুরুজি নানক সবচেয়ে বেশি দোস্তি পাতিয়েছিলেন চারপাশের গরীব মজদুরের সাথে। এই পরামর্শই আমিও তোমাকে দেব বা দিতে চাই। উদাসী আলমাস্ত সেই শহরে আছেন। তুমি গিয়ে তাঁর শিষ্য ত’ হও। ওনার এখন বয়স হয়েছে। তাই উনি সেখানে একটি ‘মঞ্জি’ স্থাপন করলেও, ঐ শহরের মোগল নবাবের সাথে দেন-দরবার করে একটি গুরুদুয়ারা স্থাপন করা এই বয়সে ওনার জন্য খুবই কষ্টের কাজ হয়ে যায়। এছাড়া তুমি ফার্সি জানো- আগে মোগলদের আদালতে কিছু দিন পেশকারের কাজ করেছো। তাই ফার্সি বলতে-লিখতেও পারো। তাই আমি চাই যে গুরু নানকজি তাঁর উদাসী জীবনের বা প্রব্রজ্যার সময় ভারতের যে প্রধান অঞ্চল বা শহরগুলোতে ঘুরেছেন, তার অন্যতম শহর জাহাঙ্গীর নগরে তুমি আলমস্ত জী’র সাথে মিলে একটি গুরুদুয়ারাই স্থাপন করো- ঠিক যেখানে তিনি ছিলেন- সেখানে! পারবে?’

 

‘ওয়াহেগুরু (ঈশ্বর) যদি কৃপা করেন, তবেই!’

‘জয় ওয়াহেগুরু! জয় খালসা!’

‘জয় খালসা!’

 

২.

তা’ দেখতে দেখতে এই জাহাঙ্গীর নগরে আজ প্রায় ছ’মাস হয়ে গেলো ভাই নাথ এসেছেন। প্রথম তিন মাস গেলো শহরটা চিনতে আর শায়েস্তা খাঁ-র দরবারের লোকজনের সাথে একটু চেনা-পরিচয় বা সম্পর্ক পাতাতে। উদাসী আলমাস্তের শিষ্যত্ব নিলেও গুরু তাঁর সাথে আচরণ করেন বন্ধুর মতো - অস্বীকার করা যাবে না। আর শেষ তিন মাস দরবারের ছোট থেকে বড় পর্যায়ের অগুণতি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সাথে বিস্তর দেন-দরবারের পর পর খোদ নবাব শায়েস্তা খাঁর সাথেই সে গেল সপ্তাহে কথা বলতে পেরেছে। নবাব নিজেও নাকি নানা ভবনের নক্সা করতেন যৌবনে বা এখনো করেন। তাই গত হপ্তায় কয়েক মিনিটের সাক্ষাতে এই জাহাঙ্গীর নগর শহরের নবাব নিজেই তাঁর গমগমে গলায় বললেন, ‘আমরা মোগলরা সবার দ্বীন বা ধর্মকে শ্রদ্ধা করি। এই বিশাল হিন্দুস্থানের যেখানে খুশি মানুষ মসজিদ বানাক কী মন্দির বা গুরুদুয়ারা বানাক- কোন সমস্যা নেই। কিন্তু তুমি যে গুরুদুয়ারা বানাতে চাও, তার নক্সা ঠিক করেছো কোন?’

 

এবার ঘাবড়ে যান ভাই নাথ। তিনি ধর্ম-কর্ম করা মানুষ। কিন্তু স্থাপত্য বা নক্সার কী জানেন?

 

‘হা- হা- নক্সা ছাড়া গুরুদুয়ারা কী করে হবে? আমার বহুত উমর ভি হয়েছে। নবাবজাদী দুখত রহমত বানো ভি এক মশহুর নক্সাকার। উনকা হাত কো কোই জবাব নেহি! লেকিন হামকো এক বাত বতাইয়ে!’

‘বোলিয়ে জ্বি!’

 

‘শিখ- ইয়ে মজহাব কি লোগো হিন্দু ঔর মুসলিম? শিখ সেনানীকো সাথ মোগল সেনানীকো হামেশা জঙ্গ হোতি হ্যায় মগর শিখ লোগো মে বুত-পরস্তি নেহি করতি হ্যায়- এই যে শিখ সৈন্যরা মাঝে মাঝেই মোগলদের সাথে যুদ্ধও করছে আবার প্রতিমা পূজাও তারা করে না। আবার মুসলিম কী ফিরিঙ্গি কী তরো নেহি উনকো নাম-ধাম- তাদের নাম-ধামও মুসলিম বা ঐ খ্রিষ্টান ফিরিঙ্গিদের মত নয়। নাম আবার তাদের হিন্দুদের মত। শিখরা তবে কী?’

 

এক মূহুর্ত চুপ থেকে ঠিক সেই উত্তরটিই দিয়েছিলেন ভাই নাথ যা এক শতাব্দী আগে লাহোরের এক গ্রামের এক নদীতে বেশ কিছুটা সময় ডুবে থেকে, মাথা তুলে যুবক নানক যেদিন উদাত্ত গলায় বলে ওঠেন: ‘হাম হিন্দু ঔর মুসলমান কোই নেহি হ্যায়। হাম ত’ ইনসান হ্যায়। আমি হিন্দু বা মুসলিম কেউ নই- আমি মানুষ-আজিম-উশ-শান।’ 

 

শায়েস্তা খাঁ একথার উত্তরে দুই হাত প্রসারিত করে দরবার ভেঙে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। বলেছিলেন ঠিক পরের সপ্তাহে এলে প্রাসাদের কর্মচারীরাই তাঁকে পিতার হয়ে এই জাহাঙ্গীর নগরের নানা গুরুত্বপূর্ণ দালানের নক্সাকারী দুখতার রহমত বানো বা পরী বিবির খাস কামরার পাশে নিয়ে যাবে। 

 

সেই কথামতোই আজ যেতে হবে খোদ শায়েস্তা খাঁ-র প্রাসাদে। নবাবজাদী পরী বিবির সাথে জাহাঙ্গীর নগরে গুরু নানকের স্মৃতি রক্ষার জন্য একটি গুরুদুয়ার স্থাপনের নক্সা বিষয়ে কথা বলতে। নবাবজাদীর সাথে বৈঠকে বের হবার সময় উদাসী আলমাস্ত শিষ্যের সাথে একটু পরিহাসও করেছেন, ‘লোগো মে ক্যাহতা হ্যায় কী পরী বিবি সিরফ পরী কা তরো খুবসরত হ্যায়। লেকিন উন বড়িয়া নক্সাকার হ্যায়। তুমহারা দিল কো সামলা রাখো!’ 

 

৩.

এখন চৈত্র মাস চলছে। বঙ্গাল মুল্লুকে চৈত্র মাসেই বিলকুল গরম। তার ভেতর খোদ এই মুল্লুকের নবাবজাদীর সাথে তাকে কথা বলতে হবে? একটু ইত:স্তত করেই ভাল পোশাক কী পরবেন সেটা নিয়ে ভাবেন ভাই নাথ। যদিও জাহাঙ্গীর নগরের নবাবজাদীর সাথে সরাসরি বৈঠকের সম্ভাবনায় উচ্ছসিত ভাই নাথের হুট করে, দিল্লির শহরতলিতে একটি ছোট-খাটো হাভেলিতে থাকা তাঁর স্ত্রীর ঘোমটা টানা মুখটাও এক ফাঁকে মনে পড়ে যায়। তবু খোদ রূপবতী নবাবজাদীর মহলে ডাক পড়ায় একটু বিচলিত ত’ ভাই নাথ বটেই। 

 

তা’ শায়েস্তা খাঁর প্রাসাদ বা লালবাগ কিল্লার সামনে যতক্ষণে পৌঁছলেন ভাই নাথ, ততক্ষণে চৈত্রের সূর্য মাথার উপরে। গনগন করছে রোদ। যদিও একটি ঘোড়ায় চালিত টাঙ্গায় করেই এসেছেন তিনি, জাহাঙ্গীর নগরের পথে পথে ভিস্তিওয়ালাদের দেখা গেলো- অধিবাসীদের পিপাসার পানি সরবরাহ করার জন্য ওরা সবাই পানির ভিস্তি নিয়ে বের হয়েছে। বৈশাখ আসার আগেই ‘কুলফি মালাই’ বেচা-বিক্রির হাঁক শুরু হয়েছে। বাচ্চারা সেসব কুলফি মালাইঅলাদের পিছু পিছু ছুটছে। আজ নবাবের দরবারও নয়। খোদ মোগল জেনেনা মহলের অন্দরে- কোন দাসী-বাঁদীর সাথেও দেখা করা নয়- স্বয়ং নবাবজাদীর খাস কামরার একদম কাছাকাছি একটি বৈঠকী কামরায় যেতে হবে ভেবে ভাই নাথ আবার ঘেমে ওঠেন। 

 

‘আইয়ে আপ- আইয়ে হামকো সাথ!’

 

কোমরে তলোয়ার ঝোলানো দুই খোজা রক্ষী কোথা থেকে সটান ভাই নাথের সামনে এসে দাঁড়ায়। এই সব রাজ-রাজড়া, নবাব-বাদশাহদের মকানে এই একটি বিষয়। সব কিছু তাদের কেমন জাদু করা একটি ব্যবস্থাপনা! বলা নেই, কওয়া নেই- সব কিছু যেন অলক্ষ্যে কার সূতার নির্দেশে পুতুল খেলার মত ঠিক হয়েই থাকে। 

 

দুই খোজা রক্ষীর পিছু পিছু প্রাসাদের ভেতরের নানা অলি-গলি, কক্ষ ও কামরার কৌণিকতা পার হতে হতে জেনেনা মহলের পাশে পৌঁছাতেই কানে আসতে থাকে নারী ও বৃহন্নলাদের গলার হাসি ও কথার শব্দ। দু’জন বৃহন্নলা বাঁদী গোলাপী বর্ণ শেলোয়ার-কামিজে, নারীর চেয়েও বেশি দেহ বিভঙ্গ প্রকট করতে যাবার আত্যন্তিক প্রচেষ্টায় ও চড়া প্রসাধন সমেত মুখে ভাই নাথের দিকে তাকিয়ে হাসি ছুঁড়ে দেয়। ভাই নাথ উপেক্ষা করেন। মোগল বাদশাহর জেনেনা মহলের কাছে এসে কী বৃহন্নলার দিকে চেয়ে দেখবেন নাকি?

 

‘ইস কামরা মে- বৈঠিয়ে আপ!’ 

 

দুই খোজা রক্ষী ভাই নাথকে তর্জনীর ইঙ্গিতে একটি কামরায় ঢুকতে বলেন। কক্ষটির উঁচু দেয়ালে নানা ফুল-লতা-পাতার নক্সা। পুরো কক্ষ জুড়ে সুদৃশ্য ফরাস পাতা। তার উপর কাশ্মিরী গালিচায় মোড়ানো তক্তাপোষ ও জাজিম। মখমলের বালিশ। অতিথিদের বসার ব্যবস্থা। রূপোর হুঁকোদানী। মাথার উপর ঝাড়-লণ্ঠন। যেমন যেমন হবার কথা, সবটাই তেমন। তবে এই কামরার সাথেই মাঝখানে গাঢ়, সবুজ মখমলের এক প্রকান্ড পর্দার ওপারে কী আর একটি কক্ষ? সেখানেই কী নবাবজাদী বসে?’

 

‘খোশ আমদেদ। সুবা বঙ্গাল কী নবাব শায়েস্তা খানকো তরফ সে আপকো বহোত শুক্রিয়া। তশরীফ রাখিয়ে, জ্বি!’

হ্যাঁ- সবুজ ঐ মখমলী পর্দার ওপ্রান্ত থেকেই এক কিন্নরী কণ্ঠের কথা ভেসে আসছে বটে। 

‘আপকো মেহেরবানী, নবাবজাদী। বহুত শুক্রিয়া।” 

 

অদেখা নবাবজাদী এবার জানতে চাইলেন যে ভাই নাথ কোন আহার্য গ্রহণ, পানীয় পান বা ধূমপান করবেন কীনা? এখানে শুধু মুসলিম নয়, ব্রাম্মণ থেকে শুরু করে নানা জাতের রাঁধুনী ও পরিবেশনকারী আছেন। 

‘আপ ব্রাম্মণ ঔর জাঠ ঔর---?’

 

কী উত্তর দেবেন ভাই নাথ ভাবতে থাকেন। গুরু নানক নিজে পাঞ্জাবের ‘ক্ষত্রী’ বা অভিজাত পরিবারের সন্তান হয়েও শিখ ধর্মে জাত-পাত রাখতে চাননি। কিন্তু, জাত-পাত এমন এক ব্যবস্থা যে এই বিশাল ভারতের মাটিতে বুদ্ধ বা মহাবীর থেকে সন্ত নানক- নানা সাধু পুরুষ এর বিরুদ্ধে কথা বলেও তাকে পুরোপুরি ঝেঁটাতে পারেননি। গুরু নানক কি চেষ্টা কম করেছেন? সব পুরুষের পদবি ‘সিং’ আর সব নারীর পদবি ‘কাউর’ করে দিয়ে পূর্বপুরুষের অতীত পেশার চিহ্ন বংশনামে থেকে যেন সমাজের ভেতর এ ওকে অপদস্থ না করে, তেমন উদ্যোগও নিয়েছেন। কিন্তু, একবার দাক্ষিণাত্যেও একটি কাজে গিয়ে ভাই নাথ দেখেছেন যে ওলন্দাজদের বানানো এক গির্জার ভেতরে খ্রিষ্টান হয়ে গিয়েও কয়েকজন মাদ্রাজি কার পূর্বপুরুষ কী কাজ করতো বা কার বংশনাম কী ছিল- সেসব নিয়ে তীব্র কলহে ব্যস্ত। তবে নানকজী চেষ্টা করেছেন। সেই চেষ্টা থেকেই প্রতি শুক্রবার গুরুদুয়ারাগুলোয় সাপ্তাহিক প্রার্থনার সময় সবাই এক পংক্তিতে বসে ‘লঙ্গর’-এ প্রসাদ খাবার বিধান তিনি করে গেলেও রান্নার কাজ আবার শুধু ব্রাম্মণরাই করে। তাতে অন্যদের অভিমান হয়। কত যে ঝামেলা! আরো একটা বিষয় ভাবলে অবাক করা। শিখদের সব বড় গুরু কিনাই এই ক্ষত্রী জাতের! তবে ক্ষত্রীরা আর সংখ্যায় ক’জন? পাঞ্জাবের যত মানুষ এই নতুন ধর্ম নিলো, তাদের ভেতর পেশায় ‘জাঠ’ বা কৃষকই বেশি। অথচ, সংখ্যায় কম হয়েও ‘ক্ষত্রী’ আর ‘অরোরা’রাই সবার উপর ছড়ি ঘোড়ায়। এছাড়াও আছে আহলুওয়ালিয়া যারা ঘোল থেকে মদ- সব কিছু বানায় বা পাতন করে, দেশোয়ালী কম্বোজ, রামগরহিয়া (ছুতার), রাজপুত ক্ষত্রিয়, রাজশিখ (কর্মকার), লবণস (বণিক), কুমহার (কুমোর), মজহাবি (সাফাইকারী), রবিদাসীয়া (চামার)। আগের মত অত বাছাবাছি আর না থাকলেও পুরো সমান হয়ে গেছে সব কিছু তা-ও বোধ হয় না। 

 

যাকগে...কীসব ভাবনায় ডুবে গেছিলেন ভাই নাথ! নবাবজাদী তার রিনরিনে কণ্ঠস্বরে পর্দার ওপার থেকে একই প্রশ্ন দ্বিতীয়বারের মত ছুঁড়ে পাঠালেন যে ভাই নাথ কোন শরবত পান, হুঁকো সেবন বা কোন আহার্য করবেন কীনা? নাহ্- পাঞ্জাবে শিখ-মোগলে যত যুদ্ধ হোক, জাহাঙ্গীর নগরের এই বৃদ্ধ নবাব শায়েস্তা খাঁ ও তদীয় সুকন্যা পরী বিবি ভাল ব্যবহার করছে তাঁর সাথে।

 

‘আপকো মেহেরবানী- নবাবজাদী! হাম ত’ কুছ নেহি খাউঙ্গি ঔর পিউঙ্গী।’ 

‘আপ কা খিয়াল। আভি ত’ বাতাইয়ে কো আপকো শিখ মজহাব মে কোই বুত-পরস্তি হ্যায়?’

‘নেহি। হামকো কোই প্রতিমা উপাসনা নেহি হ্যায়। লেকিন এক গ্রন্থ সাহিব-’

 

 

ধীরে ধীরে জমে ওঠে আলোচনা। গুরু নানক কোন শিখকেই ‘উদাসী’ হতে বলেননি যদিও নতুন ধর্ম স্থাপনের শুরুতে ভারতের নানা প্রদেশে সন্ন্যাসীদের আখড়া থেকে সূফীদের মাজারে ঘুরে বেড়িয়েছেন। আর নতুন ধর্ম প্রচারের আগেই- অল্প বয়সেই তাঁর বাবা-মা’র পছন্দে বিয়ে হয়েছিল। সুতরাং, সংসার ধর্মকে কখনোই অস্বীকার করেননি। কিন্তু তাঁর ছেলেই এখন ‘উদাসী’ মতবাদ প্রচার করছে যা হিন্দু ধর্মের সন্ন্যাস গ্রহণের মতই। উদাসী আলমাস্ত যেমন এক সন্ন্যাসী। ভাই নাথের অবশ্য সংসার আছে পাঞ্জাবে। তা’ এখন ‘আকালী’ ও ‘উদাসী’- উভয় মতের মানুষেরা মিলেই নতুন এ ধর্ম প্রচার-প্রসারের কাজ করছেন। 

 

‘আকালী অর্থ?’         

 

‘আকালী’ অর্থ যারা চুলে কঙ্গ বা কাঠের চিরুণী খুঁজে থাকে, ‘কড়া’ বা হাতে লোহার বালা পরে, ‘কৃপাণ’ বা লোহার তরবারী সাথে রাখে, ‘কাচ্চা’ বা সূতীর পোশাক পরে আর ‘কেশ’ বা চুল বড় রাখে। ‘আকালী’রা এসব মানলেও ‘উদাসী’রা মানে না।’ 

 

নবাবজাদী পরী বিবিকে বেশ কৌতূহলীই মনে হয়। খুঁটি-নাটি নানা প্রশ্ন তিনি করতেই থাকেন। 

 

‘ক্ষমা করবেন এত বেশি প্রশ্ন করার জন্য। কারণ আপনাদের উপাসনা স্থানের নক্সা তৈরি করতে হলে সব ত’ আগে আমাকে ভাল ভাবে বুঝে-পড়ে নিতে হবে। আর মনে হচ্ছে আজ একবেলার আলোচনা এটা নয়। আরো দু/একবার বসতে হবে।’ 

 

৪.      

বিরঙ্গে রোখাত জামানে জেন্দানে মানাস্ত

বার হিচ দেলি মাবাদো বার হিচ তানি

আনখ-আজ ঘাম-এ হেজরান-এ তো বার জান-এ মান-আস্ত (রুমি)

 

(যখন তোমার মুখ দেখতে পারিনা, তখন পুরো পৃথিবী আমার কারাগার হয়ে দাঁড়ায়। আর যখন আমরা পৃথক হয়ে যাই, হৃদয়ে গভীর বিষাদ জাগে। পৃথিবীর অন্য কোন আত্মার জন্যই এমন দুর্দশা আমি কামনা করি না)। 

 

নাহ্, নবাবজাদীকে কই আর দেখা হলো ভাই নাথের? তবে তাঁর সাথে প্রথম দিন সহ বার চারেক বৈঠক ত’ করতে হয়েছে। স্ত্রী-বর্জিত এই দূর বঙ্গাল মুল্লুকে পর্দার ওপার থেকে নবাবজাদির মিহি গলার স্বর, তাঁর হাতের বেলোয়ারি চুড়ির ঝঙ্কার, কথার ফাঁকে ফাঁকে কখনো হাল্কা হাসির শব্দই ত’ ভাই নাথকে এত নিকটবর্তী হয়েও এত দূরের এক অদেখা রাজকন্যার রাঙা রূপ যেন দু’চোখ ভরে দেখতে সাহায্য করে। যেন চন্দ্রালোকিত রাতে এক পরী উড়ে বেড়াচ্ছে তার দুই শুভ্র ডানা তুলে! 

 

‘আমি বলি কী একটি ফুলের বাগান থাকুক আপনাদের গুরুদুয়ারার বারান্দায়?’

‘বিলকুল নবাবজাদি।’ 

‘আচ্ছা- আপনারা দেব-দেবীর প্রতিমা পূজা করেন না; আবার আমাদের কোরানের মতই আপনাদের ‘গ্রন্থ সাহিব’কে একটি রেহেলের উপর রাখেন। কিন্তু দেব-দেবীর প্রতিমাকে যেমন মন্দিরে সামনে খাবার দেওয়া হয়, বাতাস করা হয়, ঘুম পাড়ানো হয়...আপনাদের ‘গ্রন্থ সাহিব’কে তেমন করা হয়, না?’

‘জ্বি।’ 

 

‘আমি মনে মনে যে নক্সাটি আঁকছি আর খানিকটা কাগজে-কলমেও আঁকছি, সেখানে গম্বুজ এবং খিলানগুলোতে পদ্ম থাকবে। মূল ভবনটি ভাই নাথ জি- চতুষ্কোণ হবে। ভেতরে আপনাদের মূল প্রার্থনার কক্ষের পুরো মেঝেই থাকবে খোলা যেন প্রার্থনাকারীরা প্রার্থনায়...আপনাদের মজহাবে প্রার্থনা অনুষ্ঠানকে কী বলে যেন?’

‘সঙ্গত।’

 

‘হ্যাঁ- সঙ্গতের সব প্রার্থনাকারী এসে মেঝের উপর আপনাদের ঈশ্বর বা ওয়াহেগুরুর উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করবেন। আর ঘরের ঠিক মাঝখানে একটি সুন্দর মঞ্চ- এটাই হবে আপনাদের ‘দরবার সাহিব’ যেখানে ‘শ্রী গুরু গ্রন্থ সাহিব’কে একটি সিংহাসন বা ‘তখতে’র উপর রাখা হবে। আর একটি সুন্দর চামর দিয়ে এই বইটি ক্রমাগত বাতাস করা হবে- ‘দরবার সাহিবে’র ভেতর আপনার কথা মতো আর একটি ছোট কক্ষ এঁকে দিয়েছি যেখানে সারা দিনের প্রার্থনার পর ‘গ্রন্থ সাহিব’ বিশ্রাম নেবে। একই ত’ ‘সচ খন্ড’ বলেন আপনারা, তাই না?’ 

 

‘বিলকুল- আর একটা সরোবর আঁকার কথা বলেছিলাম, নবাবজাদী?’ 

‘হ্যাঁ- হ্যাঁ- ওটাও এঁকে দিচ্ছি। খুশরুখ...’

 

খুশরুখ নামের এক বৃহন্নলা বাঁদী পর্দার ওপার থেকে পরী বিবির হাতে আঁকা পেন্সিল স্কেচ এনে ভাই নাথের হাতে দিলে তিনি চোখ বোলালেন। ঠিক ঠিক যেমনটি তিনি তিন/চার বার বৈঠকে বুঝিয়েছেন, তেমনটিই এঁকেছেন পরী বিবি। প্রতি শুক্রবার প্রার্থনার পর লঙ্গর খানায় সব ধর্ম-বর্ণের অন্তত: শ তিনেক নর-নারী-শিশু যেন এক সাথে পাত পেড়ে খেতে পারে- এমন লঙ্গরখানার খাবার রান্না করার জন্য রান্নাঘর থেকে শুরু করে ‘নিশান সাহিব’ বা শিখ পতাকা ওড়ানোর দন্ড পর্যন্ত- সবই নিখুঁত হাতে এঁকেছেন এই রাজকন্যা। আবার ‘গুরুদুয়ারা’য় ঢোকার মুখে সারা পৃথিবীর ধূলো-বালি নিয়ে ঢোকা আগতরা যেন পা ধূয়ে ঢুকতে পারে, তার জন্যও খানিকটা জায়গা রাখা হয়েছে। নাহ্- রাজকন্যারা বিলাসী হয় বলে এত দিন জানতেন ভাই নাথ। কিন্তু এই রাজকন্যার সাথে বার চারেকের বৈঠকে তাঁর পড়া-শুনো আর পরিশ্রমে মুগ্ধ না হয়ে কোন উপায়ই রইলো না। কিন্তু, শেষ দিনের বৈঠকে আরো বিষ্ময় অপেক্ষা করছিল ভাই নাথের জন্য। নবাবজাদিকে বিদায় জানিয়ে উঠবার সময়ে সহসা তিনি মিনতি করলেন, ‘ম্যায় তো আপকো এক খুশিকো বাত বতাইয়ে চাহতি হুঁ। দো মাহিনা বাদ- দো মাহিনা বাদ হামারা শাদি হ্যায়।’ 

 

‘নবাবজাদি- সে কথা জাহাঙ্গীর নগরের সব প্রজা আর আমার মত বাইরের রাজ্য থেকে আসা অতিথিরাও জানে। তবে আপনি সুবা বঙ্গালের শায়েস্তা খানের মেয়ে হয়ে আমাকে নিজ মুখে বললেন- এ ত’ সত্যিই আমার সৌভাগ্য।’ 

 

উত্তরে অদেখা রাজকন্যা তাঁর বিয়েতে ভাই নাথের আশীর্ব্বাদ ও শুভেচ্ছা কামনা করলেন। 

 

৪. 

না হফত হেজার সাল-এ শাদি-ইয়ে জাহান

ইন মেহনত-এ হফত রোজ ঘাম মি-আরজাদ (হাফিজ)

(সাত হাজার বছরের আনন্দ কখনো 

তূল্য কি হয় সাত দিনের বিষাদের?)

 

জাহাঙ্গীর নগরে থাকতে থাকতেই পরী বিবির আচমকা মৃত্যু সংবাদ কানে এলো ভাই নাথের। এক তরুণী রাজকন্যা, যার বিয়ে মাত্র ঠিক হয়েছে, কোন্ সহসা ব্যধিতে এমন অকাল মৃত্যু হলো তাঁর- কে জানে? তাঁর বাকদত্ত শাহজাদা আজম এ খবরে দিল্লি থেকে ছুটে আসে শায়েস্তা খানের সাথে মিলেই পরী বিবির মাজার নির্মাণ শুরু করলো, কিন্তু ভাই নাথ? যে পরী বিবিকে দেখতেই পায় নি? কিন্তু, চার/চারটি বৈঠকে পর্দার অন্তরাল থেকে ধর্ম-স্থাপত্য-চিত্রকলা সহ কত মজার মজার বিষয়েই না তাঁদের দু’জনার গল্প হয়েছে!

 

‘আচ্ছা- আবুল ফজলের ‘আইন-ই-আকবরী’তে আমি পড়েছি যে আপনাদের গুরু নানক- মাফ কিজিয়ে- উন তো সবকো গুরুজি- হ্যাঁ, নানকজি সিলেট থেকে কামরূপ যাবার সময় ওনার এক শিষ্য ভাই মর্দানাকে নাকি এক ফকির নূর শাহ যাদুগরি করে ভেড়া বানিয়েছিলেন? কিন্তু গুরু নানকজিও বহোত কেরামতি জানতেন? তাই তিনি পাল্টা যাদুগরি করে ভাই মর্দানাকে আবার ইনসানের দেহ ফিরিয়ে দিলেন? ইয়ে সচ বাত ঔর কিসসা হ্যায়? মুঝকো দিমাগ মে আতা হ্যায় কী ইয়ে সব কিসসা হ্যায়!’

 

‘পতা নেহি!’ বলে হেসে ফেলেছিলেন ভাই নাথ- আলোচনাকে আর থমথমে দিকে গড়াতে না দেয়াই ভাল। ঠিক যেমন নবাবজাদিও প্রসঙ্গ তুলেই আবার অন্য দিকে নিয়ে গেছেন। 

 

‘বঙ্গাল মে আপকো গুরু নানকজী ঔর কৌন কৌন শহরো মে গয়্যা থি?’ 

‘শুনেছি উনি চট্টগ্রামে গিয়ে একটি ‘মঞ্জি’ বানিয়েছিলেন।’

‘মঞ্জি?’

‘গুরুদুয়ারা বানানোর আগের ধাপ। খুব ছোট-খাটো কিছু একটা। ‘গ্রন্থ সাহিব’ প্রতিষ্ঠার পরই কেবল একটি স্থাপনাকে আমরা ‘গুরুদুয়ারা’ বলি।’ 

‘ওহ- আর ইসি কো বাদ?’

‘হ্যাঁ, সেই ‘মঞ্জি’র দায়িত্ব ভাই ঝান্ডিয়া নামে কাউকে দিয়ে সিলেট হয়ে চলে যান।’ 

 

দু’মাসে পনেরো দিন অন্তর করে চারটি বৈঠকে কত টুকরো টুকরো গল্প! আর এমন তরতাজা রাজকন্যা কি মরেই গেলো? আসলে পরী বিবির সাথে পরিচয়ের আগে মেয়েমানুষ মানে বাল্যকালেই বিয়ে হওয়া স্ত্রী ছাড়া আর কাকেই বা তিনি তেমন চেনেন? সেই স্ত্রীর সাথে রান্না-বান্না কী হবে, তিন বাচ্চা কে কী করছে ছাড়া আর কোন কিছু নিয়েই কখনো আলাপ হয়নি। দূর এই বঙ্গালদেশে এসে নারীর সাথে কী যে এক নতুন পরিচয় হলো ভাই নাথের! 

 

৫. 

প্রতি দিনের মত আজো খুব সকালে ঘুম ভেঙে গেলো। মন খুব চাইলেও সামনের বিস্তীর্ণ ঢাকা ভার্সিটি ক্যাম্পাসে ততটা হাঁটতে বের হওয়া হয় না। গুরুদুয়ারার ভেতরেই যা গাছ-পালা আছে, সেখানেই খানিকটা পায়চারি করা হয়। ইংরেজি ত’ বটেই, হিন্দিও তিনি তেমন ভাল বলতে পারেন না। গরীবের ছেলে বলেই ত’ এখানে ‘গ্রন্থী’ হয়েছে। বড়লোকের ঘরে জন্মালে ইংরেজি মাধ্যম স্কুল বা ভাল কোন পাঞ্জাবি স্কুলেই পড়া-লেখা করে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হতো। তাহলে আর স্ত্রী-সন্তান ফেলে এই দূর দেশে দু’টো ডাল-রুটির জন্য তাকে পড়ে থাকতে হয় না। এদেশের ছেলে-মেয়েরা কেউ আগ্রহী হয়ে কথা-বার্তা বলতে এলে চুপ করেই থাকতে হয়। বিশেষতঃ নানা পত্রিকার সাংবাদিকরা যখন আসে। কাজেই এই গুরুদুয়ারার দেয়ালে ইংরেজি লেখাগুলো বেশ কষ্ট করেই পড়তে হয়। 

 

‘ওয়াহেগুরু জি কি খালসা, ওয়াহেগুরু জি কি ফাতেহ, গুরুদুয়ারা নানক শাহী, ঢাকা: এই গুরুদুয়ারা (১৫০৪ খ্রিষ্টাব্দ) শিখ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা গুরু নানক দেব জী’র (১৪৬৯-১৫৩৯) এই ভূমিতে থাকার স্মৃতি স্মরণ করে।’

‘এই পবিত্র স্থানেই তিনি এক ঈশ্বর ও শাশ্বত ভ্রাতৃত্বের কথা প্রচার করে গিয়েছেন। ষষ্ঠ গুরুর সময়ে ভাই নাথ এখানে এসে এই গুরুদুয়ারা স্থাপন করেন। তবে এই ভবন নির্মাণ শেষ হয় ১৮৩০ সালে। ১৯৭১-৭২ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পর ভবনটি মেরামত করা হয়।’ 

: সম্প্রদায় কর সেবা, পাঞ্জাব। 

 

এ জায়গাতেই কেমন ধাঁধাঁ লাগে। ঢাকার নবাবজাদী পরী বিবির হাত থেকে এই গুরুদুয়ারার নক্সা ভাই নাথ জি যদি পান ১৬৭৮ সালের আগেই- কারণ ঐ রাজকন্যা মারা গেছিলেন ১৬৭৮ সালে- দেড়শো বছর লেগেছে মাত্র একতলার এই মকানটি তৈরি হতে? যদি ১৮৩০ সালেই শেষ হয়? ভাই নাথ এদেশে এসে এই গুরুদুয়ারা বানানোর কাজ শুরু করে চলেও গেছিলেন। শেষ হলো কিনা আর ১৮৩০ সালে? মোহন্ত প্রেম দাসের উদ্যোগে? তাজ্জব কী বাত হলো ১৮২০ সালে এই ঢাকায় নাকি ৩২,০০০ মানুষের ভেতর ১৫০০ শিখ ছিল। তা’ থাকবেই না কেন? তখন ত’ সবটা মিলে এক দেশ। এখন এসব বেশ অলীক গল্পের মত লাগে শুনতে। 

 

পাশেই আর একটি ফলকে পুরোটাই ইংরেজিতে :

 

‘During 1971 war 5 (Independent) Armoured Squadron (63 Cavalry) was the first Armoured column of the Indian Army to reach Dacca. On reaching the Dacca University Grounds, they found the Gurudwara Nanak Shahi in a dilapidated state, the Guru Granth Sahib destroyed and the Granthi killed. The troops of 63 Cavalry restored the Gurudwara and reinstated Sri Guru Granth Sahib which was brought from Takhat Patna Sahib.’

 

‘The Ardas ceremony after the completion of restoration work was attended by the interim President of Bangladesh Sh. Syed Nazarul Islam and interim Prime Minister Sh. Tazuddin Shah.’

 

ইংরেজিতে বেশ  কষ্ট করেই এই দেয়াল ফলক তাঁকে পড়তে হয় । নাহ্- অস্থির লাগছে। এই জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে এদেশে কেমন এক বড় আন্দোলন শুরু হয়েছে। রাতে ঘুম হয় না। অমৃতসরে স্ত্রী আর দুই পুত্রের সাথে প্রায় রাতেই ভিডিও কলে কথা হয়। রাস্তার উল্টো দিকে ভার্সিটির দেয়ালগুলো ভরে যাচ্ছে বিচিত্র নানা ছবিতে। নেহাত গুরু নানক স্বয়ং এখানে এসেছিলেন বলে সারা পৃথিবীর শিখরা প্রাণ দিয়ে হলেও ঢাকার এই জায়গাটিকে তাদের এক পবিত্র তীর্থ মনে করে। আর তাই না এখানে ‘গ্রন্থি’ হিসেবে চাকরি করা যাচ্ছে। পরিবার থেকে দূরে থাকা হয় বলে বেতনও বেশ ভাল। কিন্তু সামনে কী হবে কে জানে? দেশভাগ হবার পরেও ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত শিখ তীর্থযাত্রীরা ত’ এখানে আসতো। পাক-ভারত যুদ্ধের পর শিখদের আসা বন্ধ হয়ে গেলেও এই গুরুদুয়ারা গ্রন্থি স্মরণ সিং ভারতে পালিয়ে যাননি। তবে, তিনি ও তাঁর এক বাঙালি মুসলিম বন্ধুকে পাকিস্তানিরা খুন করে ফেলেছিল। স্মরণ সিংয়ের আগে ১৯১৫ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত এখানে ‘গ্রন্থী’ ছিলেন শ্রী চন্দ্রজ্যোতি। আর তাঁর নিজের এদেশে ‘গ্রন্থি’-র চাকরি নিয়ে আসা হয়েছে ১৯৯২ সাল থেকে। কিন্তু, এত দিন এখানে থাকা হলো! প্রতি শুক্রবারই ভার্সিটিরই কত ছেলে-মেয়ে আসে। হিন্দুরা ত’ বটেই, মুসলিম ছেলে-মেয়েরাও আসে। পাঞ্জাবী কীর্তন শুনে আর প্রসাদ খেয়ে চলে যায়। আজ যেন কী বার? আজ মঙ্গলবার- তাই না? ৫ই আগস্ট। একটি চাপা ফিসফাস বা গুজব কানে আসছে। এ দেশের সরকার কি তবে সত্যিই বদলে যাচ্ছে?

 

কে ঢুকছে চত্বরে? দু/তিনটা অপরিচিত ছেলে। কিছু হবে কি? প্রথম কেউ যখন এখানে আসে, তেমন চোখের দৃষ্টি তাদের। 

 

‘আইয়ে-  ইয়ে ত’ হামারা গুরুদুয়ারা ঔর পরী বিবিকা নক্সা- ঢাকাকো নবাবজাদি ঔর শায়েস্তা খানো কি বিটিয়া পরী বিবি কো নক্সা। নক্স-ই-পরী!’

ভেতরের কোন এক অব্যক্ত প্রেরণায় জীবনে প্রথম সড়গর হিন্দিতে কথা বললেন গ্রন্থী।

সব খবর