সর্বশেষ

শীতকাল যায়

প্রকাশিত: ৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৪:৩০
শীতকাল যায়

শীতকাল যায়

ধ্রুব এষ


‘বনলতা সেন’ শীতের কবিতা।
শীত লাগে পড়লে।
শিশিরের শব্দের মতন।
কেন শীত লাগে বলতে পারব না।
জীবনানন্দ দাশের এরকম আরো কিছু কবিতা আছে, আমার শীত লাগে পড়লে। ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যগ্রন্থের ২৬ সংখ্যক কবিতার প্রথম পংক্তিটাই শুধু মনে করি যদি—‘এই পৃথিবীতে এক স্থান আছে—সবচেয়ে সুন্দর করুণ’—কী মনে হয়? ‘শীত আর বীতশোক পৃথিবীর মাঝখানে আজ।’ সেই শীতের সঙ্গে যখন জ্যোৎস্না মিশে যায়?
জ্যোৎস্নার শীতে
আমার কঠিন হাতে তবু তারে হ’বে যে আসিতে
জীবনানন্দ দাশের কোনও বইতে নাই, অগ্রন্থিত, ‘আজ রাতে শেষ হ‘য়ে গেলো শীত’ শিরোনামের একটা কবিতা আছে। জীবনানন্দ দাশ কী লিখেছেন?—এ জীবন ইহা যাহা, ইহা যাহা নয়;
‘সে’ কী বলছে আরেকটা কবিতায়?
সেইদিন শীত আরো বেশী হবে
কাঁকড়াবিছের ছানা এসে
তোমার হাড়ের থেকে মাংস খেয়ে বেঁচে রবে;
শীত আরো বেশি হয়ে যায়, হাড় মাংসে কাঁকড়াবিছের ছানার অস্তিত্ব প্রকট হয়ে ওঠে। কাকড়াবিছে না, কাকড়াবিছের ছানা! হাড়ের থেকে মাংস খেয়ে বেঁচে রবে।
তবু তুমি শীত-রাতে আড়ষ্ট সাপের মতো শুয়ে
হৃদয়ের অন্ধকারে প’ড়ে থাকো,—কুন্ডলী পাকায়ে!—
আড়ষ্ট সাপ রাসেলস ভাইপার? আগাড়ে পাগাড়ে এত যে দেখা যাচ্ছিল, সেইসব সাপেরা এখন কোথায়? গুজবের সাপ মিলিয়ে গেছে, তবে শীত ঢুকিয়ে দিয়ে গেছে যেসব দুর্বলচিত্ত মানুষের মগজে, কুন্ডলী পাকায়ে হৃদয়ের অন্ধকারে প’ড়ে থাকে তারা এখন? নির্জন রাত্রির মতো শিশিরের গুহার ভেতরে—?

 


আগে শীতকালে আমরা কী করতাম? রাস্তায় হাঁটতাম। ছাদে বসে থাকতাম। অমাবস্যার যোগ না জেনে নক্ষত্র বুনে কাটানোর শীতকাল সেইসব। নস্টালজিয়া। কত যুবা সেইসব শীতকালে গান শুনিয়ে গেছে পৃথিবীর অপরূপা রাজকন্যাদের—
তুমি সকাল বেলার মাঠে শিশির বিন্দু হে
তুমি হঠাৎ ঠাণ্ডা হাওয়া শীত এসেছে!
সব ভালো কি শীতকালে ঘটে? আগে ঘটত। এখনও ঘটে। শীতকালে এখনও শীত যে পড়ে, এর চেয়ে ভালো কী হতে পারে আর? কাঁকড়াবিছের ছানার শীত লাগে না?
আজ এই শীতকালের দ্বিতীয় দিবস। পঞ্চগড়ে শীত পড়েছে, সুনামগঞ্জে শীত পড়েছে, কুড়িগ্রামে শীত পড়েছে। ঢাকার শীত বিরাট ভাব ধরে আছে।
এই মনে হচ্ছে যথেষ্ট শীতকাল, এই মনে হচ্ছে, এবার ১৩ই ভাদ্র বুঝি শীতকালের জন্মই হয় নাই। বালক হাবিব এদিকে ছয়দিন আগে শৈত্যপ্রবাহের নিউজ ডেলিভারি দিয়েছে— দুই দিনের মধ্যে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ শুরু হয়ে যাবে। দুই দিনের পর দুই দিন গেছে, তারপর আরো দুইদিন, শীতকাল আছে ঢাকায় শীত নাই। শৈত্যপ্রবাহ এখনো বরফযুগে আছে। থাকুক। শৈত্যপ্রবাহ হলে মানুষের কষ্ট। জন্তু জানোয়ার, পোকামাকড়ের কষ্ট। তবে শীতকালে শীত তো পড়বে। তা যদি না পড়ে কী করব?
রাত এখন। ১১ টা ২২।
‘এখন শীতের রাতে অনুপম ত্রিবেদীর মুখ জেগে ওঠে।’
কে এই হারামজাদা অনুপম ত্রিবেদী? মান্না তুষার লিখন নাসের অমিয়শঙ্কর? ফরিদ শামীম মাকু মুস্তফা রোমেন?
অনুপমা ত্রিবেদী যদি হতো?
এখন শীতের রাতে অনুপমা ত্রিবেদীর মুখ জেগে ওঠে?
তা হবে কেন, জীবনানন্দ দাশ যেখানে কোনো অনুপমা ত্রিবেদীর কথা লিখে যান নাই!—টেবিলের অন্ধকারে তবু এই শীতের স্তব্ধতা।
গভীর শীতের রাত এইসব তবু।
আমি পড়ি :
শীত রাত আসিতেছে নেমে
চুপ-নদী চুপ-গাছ চুপ-চাঁদমারি
কোথায় ‘রুকারি’
চ’লে গেছে।
রুকারি কী? রুকারি শব্দের অর্থ চলন্তিকা আধুনিক বঙ্গভাষার অভিধানে নাই। চ্যাট জিপিটি বলছে শব্দটা ইংলিশ। এক অর্থ পাখির বসতি, আরেক অর্থ খুব ভিড়যুক্ত, নোংরা বা দরিদ্র এলাকা।—মিলে না। দরকার নাই।
চুপ-নদী চুপ-গাছ চুপ-চাঁদমারি
কোথায় রুকারি
আমি পড়ি, আমার শীত লাগে। মনে হতে থাকে শীতকাল যায়। যে শীতকাল আগে কখনো আসে নাই, সেই আশ্চর্য শীতকাল যায়।

 

১৬.১২.২৫

সব খবর