১.
‘আমি তার নাম লইয়া কান্দি,’ কিংবা ‘হবিগঞ্জের জালালি কইতর সুনামগঞ্জের কোড়া/সুরমা নদীর গাঙচিল আমি শূন্যে দিলাম ওড়া।’ এমন প্রাণ জাগানো গান শুনে শুনেই জেনেছি মহান শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাসকে। উপমহাদেশের প্রবাদপ্রতিম শিল্পী সংগ্রামী হেমাঙ্গ বিশ্বাস ছিলেন একাধারে প্রখ্যাত গণগায়ক, গীতিকার-সুরকার-সংগঠক। লোকসঙ্গীতকে কেন্দ্র করে গণসঙ্গীত সৃষ্টির ক্ষেত্রে গণসংস্কৃতি আন্দোলনের অগ্রগামী সেনার গানে একদিকে হাওরভাটির জীবনপ্রকৃতি-জীববৈচিত্র্য অনবদ্য হয়ে উঠেছে, আরেকদিকে দেশ ভাগের আখ্যান বেদনায় মূর্ত হয়ে উঠেছে। বলেছিলেন, আমার গান আমার একার সৃষ্টি নয়, একটা আন্দোলনের সৃষ্টি।
২.
গণমানুষের শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাস রয়েছেন আমাদের প্রেরণার উৎসমূলে। তাঁর গান আজো মানুষকে উদ্দীপ্ত করে। ‘ওরা আমাদের গান গাইতে দেয় না’,‘থাকিলে ডোবাখানা’,‘কাস্তেটারে দিও জোরে শান’,‘শঙ্খচিল’, ‘শহীদের খুনে রাঙা পথে’,‘আরো বসন্ত বহু বসন্ত’,‘আমরা তো ভুলি নাই শহীদ’ প্রভৃতি গান আজো যে কোন আন্দোলনে সংগ্রামে গাওয়া হয়। হেমাঙ্গ বিশ্বাস ১৯১২ সালের ১৪ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন অবিভক্ত বাংলার সিলেট (শ্রীহট্ট) জেলার হবিগঞ্জ মহকুমার চুনারুঘাটের মিরাশী গ্রামে এবং ১৯৮৭ সালের ২২ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। শিল্পীর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

৩.
জমিদার পিতার সন্তান হয়েও শ্রেণীর সীমানা অতিক্রম করেছিলেন রাজনৈতিক মতাদর্শ ও অঙ্গীকারে। শৈশবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গান শেখা না হলেও গান গেয়ে গেয়ে স্কুলে যেতেন। জ্যোতিপ্রকাশ আগারওয়ালের কাছ থেকেই নিয়েছিলেন গানের তালিম। শৈশব থেকেই গাইতেন, ভাবতেন, চর্চা করতেন বলেই লোকসংগীতে অসামান্য দখল ছিল তাঁর। লোকসংগীতের আবহ দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে সহজে পৌঁছে যাওয়া যায়; তাই লোকসংগীতের আঙ্গিকে জীবনভর গেয়েছেন গণসংগীত। প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণকে সচেতন ও সংগঠিত করতেই তিনি গান রচনা করেছেন, সুর দিয়েছেন এবং গেয়েছেনও।
৪.
হবিগঞ্জ মিডল ইংলিশ স্কুল এবং ডিব্রুগড়ের জর্জ ইনস্টিটিউটে শিক্ষা শেষে হবিগঞ্জ সরকারি স্কুল থেকে ১৯৩০ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে ম্যাট্রিক পাস করে ভর্তি হন সিলেটের মুরারীচাঁদ কলেজে। এ সময় তিনি জড়িয়ে পড়েন স্বদেশি আন্দোলনে। এ কারণে তাঁকে ছয় মাস কারাভোগ করতে হয় এবং বহিষ্কৃত হতে হয় কলেজ থেকে। ১৯৩২ সালে পুনরায় গ্রেপ্তার হয়ে একটানা প্রায় তিন বছর কারাভোগ করতে হয়। তখনই আক্রান্ত হন মারাত্মক যক্ষ্মা রোগে। বন্ড দিয়ে জেলমুক্তির নানা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় মৃত্যু নিশ্চিত ভেবে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে মুক্তি দেয়। ১৯৩৯ সালে কংগ্রেস সভাপতি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু হবিগঞ্জে এলে তাঁকে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে মানপত্র পাঠ করেন। সিলেট কমিউনিস্ট পার্টি তাঁকে সম্পূর্ণ দায়িত্ব দিয়ে গ্রামাঞ্চলে সংগঠন গড়ার কাজে পাঠায়। সে সময় রচিত হয় তাঁর বিখ্যাত গান ‘কাস্তেটারে দিয়ো জোরে শাণ’।
৫.
১৯৪২ সালে বাংলা প্রগতিশীল লেখক-শিল্পীদের আমন্ত্রণে প্রথম কলকাতায় যান সংগীত পরিবেশন করতে। ১৯৪৩ সালে তাঁর উদ্যোগে এবং জ্যোতিপ্রকাশ আগরওয়ালের সহযোগিতায় সিলেট গণনাট্য সংঘ তৈরি হয়। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের আগে ভারতীয় গণনাট্য সংঘের গানের সুরকারদের মধ্যে তিনিই ছিলেন প্রধান। ১৯৪৬ সালে আসাম প্রদেশ গণনাট্য সংঘ গঠিত হলে তিনি সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং পর পর তিনবার ওই পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। মর্মান্তিক দেশভাগে গণনাট্য সংঘ ও কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীরাও বিভাজনের শিকার হন। দেশভাগের নিষ্ঠুর পরিণতিতে তাঁর ব্যঙ্গাত্মক গান ‘মাউন্ট ব্যাটন মঙ্গলকাব্য’ দেশজুড়ে সাড়া ফেলেছিল। ১৯৫১ সালে গ্রেপ্তার হলেও অসুস্থতার কারণে ছাড়া পান। ১৯৫৭ সালে সুচিকিৎসার জন্য কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগে তাঁকে চীনে পাঠানো হয়। টানা তিন বছর চীনে থেকে চীনা ভাষাও রপ্ত করেন। চীনা ভাষায় তাঁর অনেক গানও রয়েছে। চীন থেকে ফিরে ১৯৫৯ সালে রাণু দত্তকে বিয়ে করেন।

৬.
কলকাতার সোভিয়েত কনস্যুলেটের ‘সোভিয়েত দেশ’ পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে চাকরি নিলেও এক সময় ছেড়ে দেন। ১৯৬৯ সালে নকশালবাড়ী আন্দোলনের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন দেন। তিনি ‘কল্লোল’,‘তীর’,‘লাললণ্ঠন’ প্রভৃতি নাটকের সংগীত পরিচালক ছিলেন। ‘লাললণ্ঠন’ নাটকে বিভিন্ন চীনা সুর ব্যবহার করেছিলেন। ১৯৭১ সালে ‘মাস সিঙ্গারস’ নামে গণসঙ্গীতের গানের দল গঠন করে গ্রামে গ্রামে ঘুরে-বেরিয়ে মেহনতি মানুষকে অত্যাচারের বিরুদ্ধে সচেতন করে তুলতেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গানগুলোর মধ্যে ‘হেই সামাল ধান হো’,‘তেলেঙ্গানা তেলেঙ্গানা’,‘আমি যে দেখেছি সেই দেশ’ (চীন নিয়ে), মার্কিন লোকসংগীত শিল্পী পিটার সিগারের আন্তর্জাতিক সংগীতের বঙ্গানুবাদ ‘আমরা করব জয়’, অজ্ঞাত মার্কিন লোকসংগীত ‘জন হেনরি’,‘বাজে ক্ষুব্ধ ঈশানী ঝড়ে রুদ্র বিষাণ’,‘নিগ্রো ভাই আমার পল রবসন’,‘শঙ্খচিল’ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। নাটক, যাত্রা ও চলচ্চিত্রে সুর ও সংগীত পরিচালনা করেছেন। আসামের অসামান্য শিল্পী ভূপেন হাজারিকা বস্তুত তাঁরই আবিষ্কার। তাঁরা একসঙ্গে গান গেয়েছেন, অহমীয়া ভাষায় লেখা ভূপেন হাজারিকার গান বাংলায় অনুবাদ করেছেন। তাঁর নানাবিধ পরিচয়ের অন্তরালে গুপ্ত থেকে গেছে কবি পরিচয়। তাঁর প্রত্যেকটি ছন্দোবদ্ধ লেখা যেমন সুরে, সঙ্গীতে, মূর্ছনায় মনপাখির বুকে আগুন ধরানো একেকটি গান হয়ে উঠেছে তেমনি হয়েছে একেকটি কালজয়ী কবিতা। হিরোশিমায় আণবিক বোমা ফেলার বিরুদ্ধে তাঁর কবিত্বময় উচ্চারণ, ‘সুদূর প্রশান্তের বুকে/ হিরোশিমা দ্বীপের আমি শঙ্খচিল/আমার দুডানায় ঢেউয়ের দোলা/আমার দু’চোখে নীল শুধু নীল।’
৭.
হেমাঙ্গ বিশ্বাস সমাজসচেতনতা ও শ্রেণীসংগ্রামে ঋদ্ধ এক রাজনৈতিক সংগঠক হিসেবে সাংস্কৃতিক আন্দোলনে এসেছিলেন। তাই রচনা করেছিলেন আন্তর্জাতিকতাবাদে বিশ্বাসী সর্বহারা মানুষের গান। বাংলার শীর্ণকায়-শোষিত কৃষকের ন্যায্য অধিকারের দাবি প্রতিষ্ঠার লড়াই নিয়ে লিখেছেন। নৌ-বিদ্রোহ,তেভাগা সংগ্রাম,কাকদ্বীপ-তেলেঙ্গানা-মালাবারের লড়াই তাঁর বিশ্বাসে সৃজনশীলতার প্রবল শক্তি সঞ্চার করেছিল। রাজনৈতিক বিশ্বাসে ‘সমাজতন্ত্র’ আকৃষ্ট করেছিল বলেই তাঁর লেখায়, গানে, সুর সংযোজনা, এমনকি গায়কিতেও সেই সংগ্রামেরই দৃঢ়প্রত্যয় ঘোষিত হয়েছে। আপসহীন এই শিল্পীযোদ্ধা কখনো পরাজয় মানেননি, আপস করেননি কোনো গণবিরোধী লোভনীয় বস্তু বা ঘটনার কাছে। যাপিত জীবন ছিল সাদামাটা। বিপ্লবের বর্ণময়তায় যার অন্তর্গত জীবন ভরপুর তাঁর দরকার পড়ে না বাইরের চাকচিক্যের।
লেখকঃ মহুয়া মোহাম্মদ, গণমাধ্যম কর্মী