সর্বশেষ

ভোটের আগের রাতে ‘টাকা ছিটানো’

নগদের স্রোত, আটক নেতা–কর্মী, ফলাফলে কতটা প্রভাব?

প্রকাশিত: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০
নগদের স্রোত, আটক নেতা–কর্মী, ফলাফলে কতটা প্রভাব?

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ঠিক আগের রাত যা নির্বাচনি ভাষায় ‘সাইলেন্ট পিরিয়ড’ নামে পরিচিত, সেই সময়েই দেশের বিভিন্ন জেলায় নগদ অর্থ বিতরণের অভিযোগে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে নির্বাচনি মাঠ। বাড়ি বাড়ি গিয়ে কিংবা নির্দিষ্ট ভোটার গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে টাকা দেওয়ার চেষ্টা, গাড়িতে করে বিপুল পরিমাণ নগদ পরিবহন, এমনকি হাতেনাতে আটক হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে একাধিক স্থানে। প্রশাসন বলছে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে প্রশ্ন উঠেছে—এই ‘টাকা ছিটানো’ আসলে ভোটের ফলাফলে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে?

 

নির্বাচনকে ঘিরে গত দুই মাসে নগদের চলাচল অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, জানুয়ারিতে ব্যাংকের বাইরে নগদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা, যা মাত্র দুই মাসে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি। ব্যাংকাররা জানান, এটিএম ও কাউন্টার থেকে উত্তোলন বেড়েছে প্রায় ১৯ শতাংশ। রাজধানী ও বড় শহর থেকে নিজ নিজ এলাকায় ফেরা মানুষের ব্যক্তিগত ব্যয়ের পাশাপাশি প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণা, কর্মী ব্যবস্থাপনা ও পরিবহন খাতে নগদের ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, নির্বাচনি অর্থচক্রের বড় অংশই নগদভিত্তিক হওয়ায় এই প্রবণতা স্পষ্ট।

 

এরই মধ্যে কয়েকটি জেলায় সরাসরি টাকা বিতরণের অভিযোগ সামনে এসেছে। বগুড়াসহ কিছু এলাকায় দিনমজুর, দরিদ্র ও সংখ্যালঘু নারীদের ২০০ থেকে ৩০০ টাকা করে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কোথাও কোথাও প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।

 

নগদ অর্থ বহন নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঠাকুরগাঁওয়ে। সৈয়দপুর বিমানবন্দরে তল্লাশির সময় জেলা জামায়াতের আমির বেলাল উদ্দিনের লাগেজ থেকে ৭৪ লাখ টাকা উদ্ধার করে পুলিশ। প্রথমে ৫০ লাখ বলা হলেও পরে গণনায় অঙ্ক বাড়ে। তিনি দাবি করেছেন, এটি তার গার্মেন্টস ব্যবসার অর্থ। তবে ভোটের ঠিক আগ মুহূর্তে এত বিপুল নগদ বহন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

 

কুমিল্লার মুরাদনগরে ২ লাখ টাকাসহ স্থানীয় জনতার হাতে আটক হন জামায়াত নেতা হাবিবুর রহমান হেলালী। তিনি দাবি করেন, নির্বাচনী এজেন্টদের খরচের জন্য টাকা রাখা হয়েছিল। ঢাকার সূত্রাপুরে একটি কেন্দ্রের সামনে টাকা বিতরণের সময় এক নেতাকে হাতেনাতে আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালত দুদিনের কারাদণ্ড দিয়েছে। চট্টগ্রামের চন্দনাইশে সেনাবাহিনী ও বিজিবির যৌথ অভিযানে ১০ লাখ ৪৯ হাজার টাকা ও একটি মাইক্রোবাস জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া জামালপুরে নির্দল প্রার্থীর পক্ষ থেকে টাকা বিতরণের অভিযোগে তিনজনকে সাজা দেওয়া হয়েছে।

 

আইনগতভাবে নগদ বহনের সীমা নিয়ে বিভ্রান্তিও রয়েছে। আচরণ বিধিমালা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সীমার বেশি নির্বাচনি ব্যয় ব্যাংকিং চ্যানেলে করতে হবে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক ও নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ব্যক্তিগত প্রয়োজনে যে কেউ বড় অঙ্কের টাকা বহন করতে পারেন, যদি উৎস ও ব্যবহার বৈধভাবে প্রমাণ করা যায়। কিন্তু ভোট প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে ব্যবহার হলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্প অঙ্কের নগদ অর্থ দরিদ্র ভোটারদের তাৎক্ষণিকভাবে প্রভাবিত করতে পারে, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় ২০০–৩০০ টাকাও তাৎপর্যপূর্ণ। তবে জাতীয় পর্যায়ে বড় ব্যবধানে ফল নির্ধারণে এ ধরনের ‘শেষ রাতের প্রণোদনা’ এককভাবে সিদ্ধান্তমূলক নয়। ভোটারদের আচরণ এখন দলীয় আনুগত্য, প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা, স্থানীয় ইস্যু ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার মতো নানা উপাদানে নির্ভরশীল।

 

তবে এর বড় নেতিবাচক দিক হলো—এ ধরনের ঘটনা নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ করে। ভোটারদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আস্থা কমে যায়।

 

সরকারি সূত্র জানায়, অস্বাভাবিক লেনদেন নজরদারিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যৌথভাবে কাজ করছে। তবুও নগদের বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে লেনদেন হওয়ায় নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ছে।

 

সব মিলিয়ে ‘টাকা ছিটানো’ রাজনীতির পুরোনো কৌশল হলেও এর প্রভাব এখন সীমিত তবে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য যথেষ্ট। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বচ্ছ ব্যয় ও জবাবদিহিতাই হতে পারে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের একমাত্র পথ।

সব খবর

আরও পড়ুন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল নির্বাচন

স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল নির্বাচন

জুলাই সনদ সম্পর্কে জানে না ৭৭% মানুষ, না বুঝেই গণভোটের পথে দেশ

আইআইডি জরিপে উদ্বেগজনক চিত্র জুলাই সনদ সম্পর্কে জানে না ৭৭% মানুষ, না বুঝেই গণভোটের পথে দেশ

দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশের আরও অবনমন

‘হারানো সুযোগ’ হিসেবে দেখছে টিআইবি দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশের আরও অবনমন

রাষ্ট্রীয় পেট্রোলিয়াম রিফাইনারি বেসরকারিকরণে তোড়জোড়

রাষ্ট্রীয় পেট্রোলিয়াম রিফাইনারি বেসরকারিকরণে তোড়জোড়

অন্তর্বর্তী সরকার হার্ডলাইনে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর ১৫ কর্মচারীকে শাস্তি

বন্দর চেয়ারম্যানের দাবির বিপরীতে ধর্মঘটে অচল বন্দর অন্তর্বর্তী সরকার হার্ডলাইনে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর ১৫ কর্মচারীকে শাস্তি

সংশোধিত ‘ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ’ জারি

কারাদন্ডের পরিবর্তে অর্থদন্ডের শাস্তি সংশোধিত ‘ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ’ জারি

পুলিশি হামলার প্রতিবাদ, দাবি না মানলে নির্বাচন বয়কটের হুমকি সরকারি কর্মচারীদের

নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নে বিলম্বে ক্ষোভ পুলিশি হামলার প্রতিবাদ, দাবি না মানলে নির্বাচন বয়কটের হুমকি সরকারি কর্মচারীদের

সংখ্যালঘু ও আওয়ামী লীগ–সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গেজেট থেকে বাদ ১৮৬ জন

৪৪তম বিসিএসে ১,৪৯০ জনের নিয়োগ প্রজ্ঞাপন সংখ্যালঘু ও আওয়ামী লীগ–সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গেজেট থেকে বাদ ১৮৬ জন