বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে সাম্প্রতিক নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তন আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করলেও সংঘাতপীড়িত রাখাইন রাজ্যে দৃশ্যমান কোনো স্থিতিশীলতা ফেরেনি। চীন, রাশিয়া ও ভারতসহ কয়েকটি আঞ্চলিক শক্তি নেপিদোর নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানিয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ইঙ্গিত দিয়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশেও নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। তবে রাখাইনে চলমান গৃহযুদ্ধ, প্রশাসনিক ভাঙন এবং নিয়ন্ত্রণ সংকট অপরিবর্তিত রয়েছে।
মিয়ানমারের সামরিক জান্তা জানিয়েছে, ৩৩০টি টাউনশিপের মধ্যে ২৬৫টিতে ভোট আয়োজন সম্ভব হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দেশের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ এলাকায় এখনো কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ সীমিত। সীমান্তবর্তী অঞ্চলে জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনগুলো সমান্তরাল প্রশাসন ও নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলেছে। রাখাইন রাজ্যের বড় অংশ এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে থাকায় কেন্দ্রীয় সরকারের কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ।
চীন দীর্ঘদিন ধরে সীমান্ত স্থিতিশীলতা ও চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জান্তা ও বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বেইজিং জান্তা নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেছে এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর ওপর কৌশলগত চাপ বাড়িয়েছে। উত্তরাঞ্চলে চীনের মধ্যস্থতায় কয়েকটি যুদ্ধবিরতি হলেও রাখাইনে সংঘাত কমেনি। রাশিয়ার সামরিক সহযোগিতা ও সমর্থনও জান্তার অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে।
চীনের জন্য মিয়ানমার ভারত মহাসাগরে প্রবেশের একটি বিকল্প করিডোর। রাখাইন থেকে ইউনান পর্যন্ত তেল-গ্যাস পাইপলাইন, সম্ভাব্য রেলপথ এবং কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প বেইজিংয়ের কৌশলগত অগ্রাধিকার। কিন্তু এসব প্রকল্পের বড় অংশ সংঘাতপ্রবণ এলাকায় হওয়ায় বাস্তবায়ন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
ভারতের ক্ষেত্রেও মিয়ানমার পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে সীমান্ত অস্থিতিশীলতা ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সক্রিয়তা দিল্লির জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
রাখাইনে সাম্প্রতিক লড়াইয়ে জান্তা বাহিনী বিমান ও নৌ হামলা বাড়িয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। বেসামরিক হতাহতের ঘটনাও ঘটছে, যা মানবিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রশ্নেও অগ্রগতি নেই। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, নিরাপত্তা, নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক সমঝোতা—এই তিন মৌলিক শর্ত এখনো অনুপস্থিত। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আটলান্টিক কাউন্সিল তাদের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বর্তমান পরিস্থিতিকে কার্যত অচলাবস্থা হিসেবে উল্লেখ করেছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, রাখাইনে স্থিতিশীলতা না ফিরলে নতুন করে বাস্তুচ্যুতি ঘটতে পারে, যার প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশের কক্সবাজার সীমান্তে পড়বে। ফলে নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক বার্তা থাকলেও বাস্তবে রাখাইনের ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যেই রয়ে গেছে।