অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ২৯৯ আসনের মধ্যে ২৯৭ আসনের আনুষ্ঠানিক ফলাফল ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন। দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ সহ প্রায় ২১ দলের অনুপস্থিতিতে হওয়া এই নির্বাচনের ঘোষিত ফলাফলে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটি এককভাবে ২০৯টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পথ সুগম করেছে। দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে উঠে এসেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, যারা পেয়েছে ৬৮টি আসন।
শুক্রবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, আদালতের নির্দেশনার কারণে চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৪ আসনের ফলাফল স্থগিত রাখা হয়েছে এবং শেরপুর-৩ আসনে এক প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে ভোটগ্রহণ হয়নি। ফলে ২৯৯ আসনের মধ্যে ২৯৭টির ফলাফল চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়েছে।
ঘোষিত ফল অনুযায়ী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৬টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ১টি, গণঅধিকার পরিষদ ১টি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) ১টি, গণসংহতি আন্দোলন ১টি, খেলাফত মজলিস ১টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৭টি আসনে জয় পেয়েছেন।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে, সংসদ নির্বাচনে গড়ে ভোট পড়েছে ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ। একই দিনে অনুষ্ঠিত গণভোটে অংশগ্রহণের হার ছিল আরও কিছুটা বেশি—৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯টি এবং ‘না’ ভোট পড়েছে ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭টি। কমিশনের দাবি, বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া ভোটগ্রহণ শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
এবারের নির্বাচনে মোট প্রার্থী ছিলেন ২ হাজার ৩৪ জন, যার মধ্যে ২৭৫ জন স্বতন্ত্র। দেশের মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৯ জন—এর মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৪৮ লাখের বেশি, নারী ৬ কোটি ২৮ লাখের বেশি এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১ হাজার ২২০ জন।
ভোটের হার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে অংশগ্রহণের মাত্রা বরাবরই ওঠানামা করেছে। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় নির্বাচনে ভোট পড়েছিল প্রায় ৫৫ শতাংশের কিছু বেশি। আশির দশকে এই হার কখনও ৬১ শতাংশে উঠেছে, আবার কখনও ৫৫ শতাংশের নিচে নেমেছে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ ছিল প্রায় ৫৫ শতাংশ। তবে ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি নেমে আসে মাত্র ২৬ শতাংশে, যা এখন পর্যন্ত সর্বনিম্ন। ওই বছরের জুনে পুনর্নির্বাচনে তা লাফিয়ে ৭৪.৯৬ শতাংশে পৌঁছে যায়। এরপর ২০০১ সালে প্রায় ৭৫.৫৯ শতাংশ এবং ২০০৮ সালে রেকর্ড ৮৭.১৩ শতাংশ ভোট পড়ে। পরবর্তী সময়ে ২০১৪ সালে তা কমে ৪০ শতাংশে নেমে আসে। ২০১৮ সালে ৮০.২০ শতাংশ আর সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ ছিল প্রায় ৪২.০৪ শতাংশ। সে তুলনায় এবারের ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ উপস্থিতি খুব আশাব্যঞ্জক নয় বলে মনে করছেন অনেকে।
আওয়ামী লীগবিহীন এই নির্বাচনে বিএনপির নিরঙ্কুশ জয়ের মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। এখন নতুন সরকার গঠন ও সংসদের কার্যক্রম শুরুর অপেক্ষায় রাজনৈতিক অঙ্গন।