সর্বশেষ

ধ্বসে যাচ্ছে মধ্যবিত্তের সঞ্চয়

নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় তীব্র সংকটে খেটে খাওয়া মানুষ

প্রকাশিত: ৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১৮:০৯
নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় তীব্র সংকটে খেটে খাওয়া মানুষ

বাংলাদেশে আয় বাড়লেও ব্যয়ের চাপ আরও দ্রুত বাড়ছে। মূল্যস্ফীতি কমার পরিসংখ্যান থাকলেও বাস্তবে মানুষের জীবনে স্বস্তি নেই। খেটে খাওয়া মানুষ থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত পর্যন্ত সবাই নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় সংকটে পড়েছেন। সরকারি প্রতিবেদনেও দেখা যাচ্ছে, গত কয়েক বছর ধরে মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির তুলনায় অনেক কম। ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে।

 

ঢাকার টিকাটুলির রাজধানী মার্কেটে দর্জি মোবারক হোসেনের আয় কমে গেছে প্রায় অর্ধেক। তিনি বলেন, শীতের শুরুতে কাজ থাকলেও এখন চাপ কমে গেছে। পেঁয়াজ ও তেলের দাম বাড়ায় সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। কলা, দুধ, মাংসের মতো খাবার আর নাগালের মধ্যে নেই। একইভাবে দর্জি সোলাইমান হোসেন জানান, আয় না বাড়লেও খরচ বেড়েছে। আগে গ্রাহকরা খুশি হয়ে বাড়তি টাকা দিতেন, এখন আর দেন না।  

 

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এমদাদুল হক স্বপনও সংসারে কাটছাঁট করেছেন। তিনি বলেন, এখন মাছ কেনা হয় সপ্তাহে একদিন, মাংস মাসে একবার। শীতের কাপড় কিনতে গিয়ে বড়দের জন্য নতুন কিছু কেনা হয়নি, পুরনো দিয়েই চলছে। অফিস থেকে বের হয়ে নাস্তা করার অভ্যাসও বাদ দিতে হচ্ছে।  

 

ভ্যানে চপ্পল বিক্রি করা জসিম উদ্দিন জানান, আগের শীতে দৈনিক পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা বিক্রি হলেও এবার তা চার হাজারে নেমেছে। ক্রেতা কমে যাওয়ায় রাত ১২টা পর্যন্ত ভ্যানে বসে থাকতে হয়। মতিঝিলে ভ্যান গাড়িতে পরোটা ও সবজি বিক্রি করা মাসুম হাওলাদার বলেন, আগে দিনে ৩০-৩৫ কেজি ময়দার পরোটা বিক্রি হতো, এখন তা কমে ২০-২৫ কেজি হয়েছে। মানুষ খায় কম, খরচ বাঁচাতে চেষ্টা করে।  

 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বরে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৭১ শতাংশে। সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। অথচ একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৮ দশমিক ০৭ শতাংশ। কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতেই মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির নিচে। গত ৪৬ মাস ধরে একই প্রবণতা চলছে।  

 

বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ভোজ্য তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব সব খাতে পড়ে। রিকশা ভাড়া থেকে শুরু করে হোটেলের খাবার—সবকিছুর দাম বাড়ে। বাজার কাঠামোতে দুর্বলতা ও সিন্ডিকেটের কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।  

 

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক মোস্তফা কে মুজেরী মনে করেন, খাদ্য মূল্যস্ফীতির চাপ দরিদ্র ও মধ্যবিত্তের ওপর বেশি পড়ে। দরিদ্ররা কখনো মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে, আবার অনেক সময় হতদরিদ্র হয়ে যায়। মধ্যবিত্তরা বাজেটে কাটছাঁট করে চলে, চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে না পেরে দীর্ঘদিন ভোগে।  

 

বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দেড় দশকে প্রবৃদ্ধির সুফল ধনী ও উচ্চ মধ্যবিত্তরা বেশি পেয়েছে। ২০১০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দারিদ্র্য অর্ধেকে নেমে এলেও প্রবৃদ্ধির তুলনায় দরিদ্র কমার হার দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় কম। এই সময়ে প্রায় ৯০ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এলেও ছয় কোটির বেশি মানুষ পুনরায় দরিদ্র হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।  

কোভিড-পরবর্তী সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট ও টাকার মান কমে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতি এক লাফে দুই অঙ্কে পৌঁছায়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তা সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে দাঁড়ায়। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সুদহারের সীমা তুলে দিলে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে আসে। তবে খাদ্য মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশিত জায়গায় নামেনি।  

 

মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, শুধু সুদহার দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। বাজার ব্যবস্থাপনায় সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। সরকার যদি বাজারে স্বচ্ছতা না আনে, তাহলে মূল্যস্ফীতি কমার সুযোগ নেই।  

 

বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থনীতি পুরোপুরি সচল না হওয়া পর্যন্ত মজুরি বৃদ্ধির সুযোগ নেই। সরকারি প্রকল্প কমে যাওয়ায় ব্যয়ও কমছে। নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব না নেওয়া পর্যন্ত বড় সিদ্ধান্ত সম্ভব নয়।  

 

সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মূল্যস্ফীতি কমে যাওয়া মানে প্রকৃত দাম কমে যাওয়া নয়। বরং বেশি দাম বাড়ার প্রবণতা কমেছে। তিনি খাদ্য ভর্তুকি ও সুবিধাভোগীর আওতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন।  

 

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, মূল্যস্ফীতির চাপ সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে সীমিত আয়ের মানুষের জীবনে। তাদের সঞ্চয় নেই, ফলে প্রতিটি দাম বাড়া 

সরাসরি জীবনে আঘাত হানে।

সব খবর

আরও পড়ুন

গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে এনজিও সহায়তার আহ্বান বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরের

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা কি প্রশ্নের মুখে? গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে এনজিও সহায়তার আহ্বান বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরের

উত্তর কোরিয়া এবং ফিলিস্তিনের চেয়েও দুর্বল বাংলাদেশী পাসপোর্ট

পাসপোর্ট ইনডেক্স ২০২৬ উত্তর কোরিয়া এবং ফিলিস্তিনের চেয়েও দুর্বল বাংলাদেশী পাসপোর্ট

অন্তর্ভুক্তিমূলক না হলে নির্বাচন গণতান্ত্রিক নয়

চার ব্রিটিশ এমপির বিবৃতি অন্তর্ভুক্তিমূলক না হলে নির্বাচন গণতান্ত্রিক নয়

অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত ব্যর্থতায় দীর্ঘায়িত হচ্ছে এলপিজি সংকট

দুই সপ্তাহেও সমাধান নেই অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত ব্যর্থতায় দীর্ঘায়িত হচ্ছে এলপিজি সংকট

অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত প্রস্তুতি ও সক্ষমতার ঘাটতিতে এডিপির আকার কমল ১৩ শতাংশ

স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বড় কাটছাঁট অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত প্রস্তুতি ও সক্ষমতার ঘাটতিতে এডিপির আকার কমল ১৩ শতাংশ

নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক মানে সবার অংশগ্রহণ

ইইউ পর্যবেক্ষক দলের প্রধান নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক মানে সবার অংশগ্রহণ

বাংলাদেশে নিযুক্ত নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে শপথ নিলেন ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন

বাংলাদেশে নিযুক্ত নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে শপথ নিলেন ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন

বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে ‘উদ্বেগজনক’ বললেন ব্রিটিশ এমপি প্রীতি প্যাটেল

ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার আহ্বান বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে ‘উদ্বেগজনক’ বললেন ব্রিটিশ এমপি প্রীতি প্যাটেল