আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন এক বাস্তবতা সামনে এসেছে। ভোটে জয়লাভ করলেই সরাসরি সরকার গঠন নয়, বরং প্রথমে গঠিত হবে একটি ‘গণপরিষদ’ বা ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’। এই কাঠামোর মাধ্যমে নতুন সংবিধান প্রণয়ন, জুলাই আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীদের দায়মুক্তি এবং অন্তর্বর্তী সময়ে নেওয়া বিচার ও আইনি সিদ্ধান্তগুলোর বৈধতা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। ফলে এবারের নির্বাচন কেবল সরকার পরিবর্তনের নয়, বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামো পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ এমনটাই দাবি সংশ্লিষ্টদের।
সরকারের ঘনিষ্ঠ নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ড. ইউনূসের নেতৃত্বে এই নির্বাচন মূলত গণপরিষদ গঠনের ভোট। নতুন সংবিধান কার্যকর হওয়ার পরই পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, এবং তখনই পূর্ণাঙ্গ সরকারের ক্ষমতা নির্ধারিত হবে। অর্থাৎ, এখনকার বিজয় রাজনৈতিকভাবে প্রতীকী হলেও সরাসরি ক্ষমতার নিশ্চয়তা দিচ্ছে না।
তবে এ নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তিও কম নয়। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে নির্বাচিত এমপিদের নিয়েই গঠিত হবে সংবিধান সংস্কার পরিষদ, যা প্রথম অধিবেশন থেকে ১৮০ কার্যদিবস পর্যন্ত সংবিধান সংস্কারের কাজ করবে। এই ‘১৮০ কার্যদিবস’কে কেন্দ্র করে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে অন্তর্বর্তী সরকার দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকবে। যদিও সরকার বলছে, নির্বাচনের পরপরই নতুন সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করা হবে।
অধ্যাপক আলী রীয়াজসহ সংশ্লিষ্টরা ব্যাখ্যা দিয়েছেন, ‘কার্যদিবস’ মানে ক্যালেন্ডারের টানা ১৮০ দিন নয়; সংসদের অধিবেশনভিত্তিক দিন গণনা হবে। ফলে এটি কয়েক মাস কিংবা আরও দীর্ঘ সময়জুড়ে চলতে পারে। একই সঙ্গে এমপিরা সংসদ ও পরিষদের সদস্য হিসেবে দ্বৈত দায়িত্ব পালন করবেন। সংসদ চলবে নিয়মিত আইন ও বাজেট প্রণয়নে, আর পরিষদ কাজ করবে কেবল সংবিধান সংস্কারে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের দ্বৈত কাঠামো কার্যত ক্ষমতার বিভাজন ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। একদিকে নির্বাচন, অন্যদিকে সীমিত ক্ষমতার সরকার—এতে প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা বাড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিশেষ করে গণভোটে ‘না’ জয়ী হলে সংস্কার প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়েও অস্পষ্টতা রয়েছে।
ইতিহাস বলছে, বাংলাদেশে সাধারণত নির্বাচনের এক সপ্তাহের মধ্যেই নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮ ও পরবর্তী নির্বাচনগুলোতেও একই ধারা ছিল। তাই এবারের নির্বাচনেও দ্রুত সরকার গঠনের প্রত্যাশা থাকলেও, গণপরিষদ কাঠামোকে ঘিরে বিতর্ক ও ব্যাখ্যার ভিন্নতা রাজনৈতিক অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সব মিলিয়ে, এবারের ভোট কেবল সরকার নির্বাচন নয়, রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণের এক জটিল অধ্যায়। কিন্তু স্পষ্ট আইনি ব্যাখ্যা ও স্বচ্ছ রোডম্যাপ ছাড়া এ প্রক্রিয়া জনগণের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করছে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।