কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ পদে বড় পরিবর্তন এনে চার বছরের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক-এর গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ব্যবসায়ী মো. মোস্তাকুর রহমানকে। বুধবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়। উপসচিব মোহাম্মদ আবরাউল হাছান মজুমদার-এর সই করা আদেশে বলা হয়েছে, অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সঙ্গে কর্ম-সম্পর্ক পরিত্যাগের শর্তে যোগদানের তারিখ থেকে চার বছরের জন্য তাকে নিয়োগ দেওয়া হলো। বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা সরকারের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেই গ্রহণ করবেন তিনি।
একই দিনে পৃথক প্রজ্ঞাপনে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর-এর অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করা হয়। জনস্বার্থে জারিকৃত এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর বলে জানানো হয়েছে।
‘ট্রাস্ট বিল্ডিং’ ও সুদের হার কমানো
নতুন দায়িত্ব পাওয়ার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় মোস্তাকুর রহমান বলেন, ব্যাংকিং খাতে আস্থা বাড়ানোই হবে তার প্রধান কাজ। “অর্থনীতির অবস্থা ও ব্যাংকিং খাতের বাস্তবতা চ্যালেঞ্জিং। আগে সবার সঙ্গে আলোচনা করে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে, শৃঙ্খলা জোরদার করতে হবে,” বলেন তিনি। একই সঙ্গে ঋণপ্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে সুদের হার কমানোর উদ্যোগও অগ্রাধিকারে থাকবে বলে জানান।
পোশাক খাতের উদ্যোক্তা মোস্তাকুর রহমান তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান হেরা সোয়েটার্স লিমিটেড-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও ছিলেন। নতুন দায়িত্বে যোগ দিতে তিনি প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন বলে জানান। তিনি ১৯৯১ সালে ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি) থেকে এফসিএমএ সম্পন্ন করেন; করপোরেট ফিন্যান্স, রপ্তানি ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় তিন দশকের বেশি অভিজ্ঞতা রয়েছে। অতীতে ব্রোকারেজ ও আবাসন খাতেও যুক্ত ছিলেন। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে তিনি বিজিএমইএ-র বাংলাদেশ ব্যাংক–বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যও ছিলেন তিনি।

বাংলাদেশের ইতিহাসে ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ বা আমলার বাইরে এই প্রথম কোনো ব্যবসায়ীকে গভর্নরের দায়িত্ব দেওয়া হলো—যা সংশ্লিষ্ট মহলে বিস্ময় তৈরি করেছে।
গভর্নর বদলে সরকারের ব্যাখ্যা
সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, নতুন সরকারের অগ্রাধিকার ও কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই পরিবর্তন আনা হয়েছে। “পরিবর্তন শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকে নয়, প্রয়োজনবোধে আরও জায়গায় হবে,”—এমন ইঙ্গিতও দেন তিনি।
বিক্ষোভের মধ্যে মনসুরের বিদায়
এর আগে দিনভর গুঞ্জন ও কর্মকর্তাদের একাংশের বিক্ষোভের মধ্যে ড. আহসান এইচ মনসুর সংবাদ সম্মেলন শেষে কার্যালয় ত্যাগ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, অল্পসংখ্যক কর্মকর্তা সাম্প্রতিক সংস্কার ও শৃঙ্খলা প্রচেষ্টাকে ক্ষুণ্ন করতে চাইছেন। ব্যাংক একীভূতকরণসহ কিছু নীতিগত সিদ্ধান্তকে তিনি রাষ্ট্রীয় নীতি ও রাজনৈতিক অর্থনীতির বিষয় হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এগুলো কোনো কর্মচারী সংগঠনের আলোচ্য নয়।

তিনি জানান, গত দুই বছর ধরে ৭৬ লাখ আমানতকারীর অর্থ সুরক্ষায় ৩২ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ নেওয়া হয়েছে—সরকার দিচ্ছে ২০ হাজার কোটি এবং ডিপোজিট ইনস্যুরেন্স ফান্ড থেকে ১২ হাজার কোটি। এক্সিম ব্যাংককে ৯,৫০০ কোটি টাকার ইকুইটি সহায়তা এবং সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ১,০০০ ও ৩,০০০ কোটি টাকার তারল্য সহায়তার কথাও উল্লেখ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর অভিযোগে কিছু কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
পদত্যাগের প্রশ্নে মনসুর বলেন, নিয়োগ–বদলি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের এখতিয়ার। পরে গণমাধ্যমকে জানান, তিনি পদত্যাগ করেননি; নতুন নিয়োগের খবর দেখেই অফিস ত্যাগ করেছেন এবং বাকি আনুষ্ঠানিকতা পরে সম্পন্ন করবেন।
নতুন গভর্নর দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি–অগ্রাধিকার, সুদহার প্রবণতা ও ব্যাংকিং খাতের আস্থা পুনর্গঠনের প্রশ্নে বাজার ও বিনিয়োগকারীদের নজর এখন তার পদক্ষেপের দিকে।