বহুল আলোচিত জুলাই জাতীয় সনদকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংস্কারের প্রক্রিয়া এগোলেও এর বিষয়বস্তু সম্পর্কে অধিকাংশ মানুষেরই পরিষ্কার ধারণা নেই। একটি সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ৭৭ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ জুলাই সনদে কী আছে তা জানেন না। অর্থাৎ, যেই সনদের ওপর ভিত্তি করে আসন্ন গণভোট ও সংস্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, সেটি সম্পর্কে জনগণের বড় অংশই অন্ধকারে রয়েছে।
ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেটিকস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইআইডি) ও ইয়ুথ ফর পলিসি যৌথভাবে পরিচালিত ‘প্রাক-নির্বাচনি জনধারণা জরিপে’ এই তথ্য উঠে এসেছে। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর হোটেল প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
জরিপ অনুযায়ী, জাতীয়ভাবে মাত্র ৩৭ দশমিক ২ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন যে তারা জুলাই সনদের বিষয়বস্তু সম্পর্কে জানেন। তবে বয়স, শিক্ষা ও বসবাসভিত্তিক বড় ধরনের বৈষম্য স্পষ্ট। ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের মধ্যে ৪৫ দশমিক ৭ শতাংশ সনদ সম্পর্কে জানলেও ৩৫ বছরের বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে এ হার নেমে আসে ২৩ দশমিক ২ শতাংশে। গ্রামাঞ্চলে জানেন এমন মানুষের হার ৩২ দশমিক ৪ শতাংশ, যেখানে শহরে তা ৪১ দশমিক ৪ শতাংশ। সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র দেখা গেছে শিক্ষাবঞ্চিতদের মধ্যে—যাদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, তাদের মধ্যে মাত্র ৮ দশমিক ৪ শতাংশ সনদ সম্পর্কে অবগত।
নির্দিষ্ট সংস্কার বিষয়েও মানুষের ধারণা দুর্বল। মৌলিক অধিকার সংশ্লিষ্ট পরিবর্তন সম্পর্কে জানেন বলেছেন ৪৩ দশমিক ১ শতাংশ, আর ৫৫ দশমিক ৩ শতাংশ এ বিষয়ে কিছুই জানেন না।
গণভোটের ব্যালট বোঝার সক্ষমতাও প্রশ্নের মুখে। জাতীয়ভাবে ৭২ দশমিক ৪ শতাংশ বলেছেন তারা ব্যালটের ভাষা সহজে পড়তে পারেন। তবে ৩৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে এই হার ৫৭ দশমিক ৪ শতাংশ এবং শিক্ষাবঞ্চিতদের ক্ষেত্রে মাত্র ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ।
সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। ৪৭ দশমিক ৯ শতাংশ মনে করেন সরকার নিরপেক্ষ, ১১ দশমিক ৩ শতাংশ বলছেন নিরপেক্ষ নয়, আর ৩৩ দশমিক ৭ শতাংশ নিশ্চিত নন। নারীদের মধ্যে এই অনিশ্চয়তা আরও বেশি।
নির্বাচন-পরবর্তী স্থিতিশীলতা সম্পর্কেও সন্দেহ রয়েছে। মাত্র ৫১ শতাংশ মনে করেন পরাজিত পক্ষ ফলাফল মেনে নেবে। বাকি বড় অংশ অনিশ্চিত বা উত্তর দিতে অনিচ্ছুক।
আইআইডির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী পরিচালক সাইদ আহমেদ বলেন, “না জেনে-বুঝেই আমরা গণভোটের দিকে যাচ্ছি। সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আরও সময় ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রচার প্রয়োজন।” তিনি সতর্ক করে বলেন, জনগণ ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিলে কী ঘটবে—এ সম্পর্কেও অনেকের স্পষ্ট ধারণা নেই।
৬ ও ৭ ফেব্রুয়ারি দেশের আট বিভাগে পরিচালিত এই জরিপে অংশ নেন ৯ হাজার ৮৯২ জন ভোটার। বিশ্লেষকদের মতে, জনসচেতনতা ছাড়া গণভোট আয়োজন হলে ফলাফল নিয়ে নতুন বিতর্ক ও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।