চলতি ২০২৪–২৫ অর্থবছরের মাঝপথে এসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ১৩ শতাংশের বেশি কমিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। সংশোধিত এডিপিতে ৩০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ কমিয়ে মোট আকার নামিয়ে আনা হয়েছে ২ লাখ কোটি টাকায়। সবচেয়ে বড় কাটছাঁট পড়েছে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে—যে দুটি খাতকে পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকার দীর্ঘদিন ধরে মানব উন্নয়নের মূল ভিত্তি হিসেবে অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছে।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় সংশোধিত এডিপি অনুমোদন দেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। সভা শেষে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, পর্যাপ্ত ও গ্রহণযোগ্য প্রকল্পের অভাব এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণেই এই বড় ধরনের কাটছাঁট করা হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ব্যাখ্যা প্রকৃতপক্ষে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশাসনিক প্রস্তুতি ও নীতিগত ধারাবাহিকতার ঘাটতিই সামনে আনছে। কারণ, আগের সরকার যেখানে পরিকল্পনা ও প্রকল্প পাইপলাইন আগেভাগেই প্রস্তুত রেখে ধারাবাহিক উন্নয়ন নিশ্চিত করেছিল, সেখানে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরও প্রয়োজনীয় মানসম্পন্ন প্রকল্প দাঁড় করাতে ব্যর্থ হয়েছে।
সংশোধিত এডিপিতে স্বাস্থ্যসেবা খাতে বরাদ্দ কমানো হয়েছে ৭৩ শতাংশ এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা খাতে ৫৫ শতাংশ। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ ১১ হাজার কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা খাতে বরাদ্দ নেমে এসেছে ১৩ হাজার কোটি টাকা থেকে ৬ হাজার কোটি টাকায়। শিক্ষা খাতে এ ধরনের বড় কাটছাঁট মানবসম্পদ উন্নয়ন ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিদায়ী ২০২৩–২৪ অর্থবছরে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এডিপির আকার ছিল ২ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা, যা সংশোধনের পর দাঁড়ায় ২ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। তুলনায় চলতি অর্থবছরে শুরুতেই এডিপি ধরা হয়েছিল মাত্র ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা, যা এখন আরও কমে ২ লাখ কোটি টাকায় নেমেছে। এই ধারাবাহিক সংকোচন উন্নয়ন অগ্রাধিকারের দুর্বলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মত সংশ্লিষ্টদের।
এডিপিতে মেট্রোরেলসহ বড় অবকাঠামো প্রকল্পের বরাদ্দও কমানো হয়েছে। এমআরটি-৬ প্রকল্পের মতিঝিল–কমলাপুর অংশে ২ থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা কমানো হয়েছে। পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, একসঙ্গে একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়নে ঢাকায় অবকাঠামোগত চাপ তৈরি হতে পারে। তবে সমালোচকদের মতে, এটি প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় সুস্পষ্ট রোডম্যাপের অভাবকেই প্রতিফলিত করে।
বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দার পেছনে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাকে দায়ী করলেও, বিনিয়োগ স্থবিরতা ও কর্মসংস্থান সংকটে কার্যকর নীতিগত উদ্যোগের অভাব নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। উন্নয়ন প্রকল্পের মানোন্নয়নে ‘পিডি পুল’ গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও, তা বাস্তবে কতটা দ্রুত ফল দেবে—সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য এটি একটি সতর্কবার্তা—পূর্ববর্তী সরকারের নির্ধারিত উন্নয়ন মানদণ্ড ধরে রাখতে না পারলে, উন্নয়ন ধারাবাহিকতায় বড় ধরনের ছেদ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।