বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন রাষ্ট্রদূত হিসেবে শপথ নিয়েছেন অভিজ্ঞ কূটনীতিক ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করান উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইকেল আর. ম্যাকফল।
শপথ গ্রহণের পর দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক মার্কিন ব্যুরো এক বিবৃতিতে জানায়, ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন যুক্তরাষ্ট্র–বাংলাদেশ সম্পর্ক বিষয়ে গভীর অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা নিয়ে ঢাকায় দায়িত্ব পালন করতে যাচ্ছেন। বিবৃতিতে বলা হয়, “বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব জোরদার এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ এগিয়ে নিতে তাঁর নেতৃত্বের দিকে আমরা তাকিয়ে আছি।”
ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের রয়েছে বাংলাদেশ বিষয়ে দুই দশকের বেশি কাজের অভিজ্ঞতা। এর আগে তিনি ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসে দায়িত্ব পালন করেছেন। গত ২৩ অক্টোবর সিনেটের ফরেন রিলেশনস কমিটিতে তাঁর নিয়োগ চুড়ান্ত করার শুনানিতে তিনি বলেন, “বাংলাদেশের গুরুত্ব এবং সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য স্বার্থ সম্পর্কে আমি সুস্পষ্টভাবে অবগত। বাংলাদেশের ভূ-কৌশলগত অবস্থান একে মুক্ত, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার করে তুলেছে।”
তিনি বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। “২০২৪ সালের আগস্টে আন্দোলনের ফলে টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা একটি সরকারের পতন ঘটে। আগামী বছরের শুরুতে বাংলাদেশের জনগণ ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে নতুন সরকার ও ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারণ করবে যা কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন হতে যাচ্ছে,” বলেন তিনি।
ক্রিস্টেনসেন আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ যাত্রায় পাশে রয়েছে। তিনি ঢাকায় দূতাবাস টিমের নেতৃত্ব দিয়ে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এবং পরবর্তীতে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ করে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের লক্ষ্যকে এগিয়ে নিতে এবং প্রতিদিন নিরলসভাবে কাজ করে আমেরিকাকে আরও নিরাপদ, শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ করে তুলতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি বাংলাদেশকে “নতুন এশীয় টাইগারদের একটি” হিসেবে উল্লেখ করে দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিপুল চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে, যা দেশটির জনগণের দৃঢ়তা ও অধ্যবসায়ের প্রমাণ। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়িক সুযোগ সম্প্রসারণ, বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা কমানো এবং দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে কাজ করার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
শপথ অনুষ্ঠানে বিশেষ আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান। সোমবার (১২ জানুয়ারি) ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের ঢাকায় আসার কথা আছে। বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রদূত হিসেবে শপথগ্রহণকারী ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনকে স্বাগত জানাতে পেরে ঢাকার যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস আনন্দিত বলে জানিয়েছে।
ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের সাম্প্রতিক দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে—২০২২ থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র স্ট্র্যাটেজিক কমান্ডের কমান্ডারের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করা। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তাঁকে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারির দায়িত্বপ্রাপ্ত সিনিয়র কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
তিনি ন্যাশনাল ওয়ার কলেজের গ্র্যাজুয়েট এবং জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল ও পরিসংখ্যানে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। স্প্যানিশ, জার্মান ও ভিয়েতনামি ভাষায় পারদর্শী এই কূটনীতিক ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র–বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্কের দীর্ঘ ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় ঢাকায় দায়িত্ব পালন করবেন। এই সম্পর্কের আওতায় বাণিজ্য, উন্নয়ন সহযোগিতা, নিরাপত্তা সংলাপ এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মানবিক সহায়তা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এদিকে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে নজরদারি বাড়ছে। গত ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে হাউস ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতারা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূসকে চিঠি দিয়ে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক মানদণ্ড রক্ষার আহ্বান জানান।
চিঠিতে বলা হয়, “বাংলাদেশের জাতীয় সংকটকালে অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আপনার এগিয়ে আসাকে আমরা স্বাগত জানাই। শান্তিপূর্ণভাবে জনগণের মতামত প্রতিফলনের জন্য অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।”
আইনপ্রণেতারা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিধিনিষেধ আরোপের বিরুদ্ধেও সতর্ক করেন এবং বলেন, মতপ্রকাশ ও সমিতি গঠনের স্বাধীনতা মৌলিক মানবাধিকার।