মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা ও সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সংঘাতের কারণে বাংলাদেশের প্রায় ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচেই থেকে যেতে পারে।
মঙ্গলবার প্রকাশিত সংস্থাটির এপ্রিল সংস্করণের সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক অস্থিরতার এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে দেশের প্রবৃদ্ধি আরও মন্থর হতে পারে।
প্রতিবেদনটি উল্লেখ করে, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টির সীমাবদ্ধতা, শ্রম আয়ের ধীরগতির বৃদ্ধি এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দারিদ্র্য বিমোচনের গতি কমে গেছে। এর ফলে সামগ্রিক জনকল্যাণ পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, জাতীয় দারিদ্র্যের হার টানা তৃতীয় বছরের মতো বাড়তে পারে। ২০২২ সালে যেখানে এ হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ, তা ২০২৫ সালে বেড়ে ২১ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমা অনুযায়ী আরও প্রায় ১৪ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়তে পারেন।
সংস্থাটি জানায়, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের যে আশা করা হয়েছিল, তা এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। আগে ধারণা করা হয়েছিল, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমা থেকে বের হয়ে আসবে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে অন্তত ৫ লাখ মানুষের এই সম্ভাব্য উন্নতি বাধাগ্রস্ত হবে। ফলে মোট ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচেই থেকে যাবে।
এছাড়া, সংঘাতের প্রভাবে শ্রমবাজারেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশ্বব্যাংকের মতে, অন্তত ৬ লাখ মানুষ কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে।
প্রতিবেদনটি সতর্ক করে বলেছে, এই সংঘাত বাংলাদেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আর্থিক খাতের দুর্বলতা, নীতিগত সীমাবদ্ধতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার ঘাটতি।
বিশেষ করে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি আয় কমে যাওয়া এবং প্রবাসী আয়ের প্রবাহে সম্ভাব্য পতনের ফলে দেশের চলতি হিসাবের ভারসাম্যের ওপর চাপ বাড়বে। একই সঙ্গে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার অস্থির থাকায় মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়েই স্থায়ী হতে পারে।
এছাড়া জ্বালানি ভর্তুকি বাড়ার ফলে সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থার ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংক একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা কৌশলের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। এর মধ্যে কাঠামোগত সংস্কার, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জোরদার, বিনিয়োগ পুনরুজ্জীবন এবং বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সংস্থাটি ২০২৬ অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ নির্ধারণ করেছে, যা আগে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ ধরা হয়েছিল। যদিও মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমার আশা করা হচ্ছে, তবে জ্বালানি ও আমদানি ব্যয়ের চাপের কারণে তা এখনও উচ্চ পর্যায়ে থাকতে পারে।