সর্বশেষ

যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা বন্ড তালিকায় বাংলাদেশ

ভিসা পেতে দিতে হবে সর্বোচ্চ ১৮ লাখ টাকার বেশি জামানত

প্রকাশিত: ৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:৩০
ভিসা পেতে দিতে হবে সর্বোচ্চ ১৮ লাখ টাকার বেশি জামানত

যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের জন্য নতুন এক আর্থিক বাধা যুক্ত হলো। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের হালনাগাদ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পর্যটন (বি২) ও ব্যবসায়িক (বি১) ভিসা পেতে বাংলাদেশিদের পাঁচ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত ‘ভিসা বন্ড’ বা জামানত জমা দিতে হতে পারে। নতুন এই নিয়ম বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কার্যকর হবে আগামী ২১ জানুয়ারি থেকে।

 

মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ভিসা বন্ডের শর্তযুক্ত দেশের তালিকা হালনাগাদ করে। প্রথমে সাতটি দেশ নিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হওয়া এই কর্মসূচির আওতা এক সপ্তাহের ব্যবধানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮টি দেশে। সর্বশেষ তালিকায় বাংলাদেশ ছাড়াও নেপাল, ভুটানসহ আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বহু দেশের নাম যুক্ত হয়েছে।

 

কী এই ভিসা বন্ড

 

ভিসা বন্ড হলো এক ধরনের ফেরতযোগ্য আর্থিক জামানত, যা যুক্তরাষ্ট্রে অস্থায়ী ভিসায় প্রবেশকারী ব্যক্তিরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেশটি ত্যাগ করবেন—এ নিশ্চয়তা হিসেবে নেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, যারা অনুমোদিত সময়ের বেশি অবস্থান করেন বা ভিসার শর্ত ভঙ্গ করেন, তাদের ক্ষেত্রে এই বন্ড বাজেয়াপ্ত হতে পারে।

 

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, বাংলাদেশি নাগরিক কেউ বি১ বা বি২ ভিসার জন্য যোগ্য বিবেচিত হলেও কনস্যুলার কর্মকর্তার সিদ্ধান্তে তাকে এই বন্ড দিতে বলা হতে পারে। বন্ডের অঙ্ক নির্ধারণ হবে ভিসা সাক্ষাৎকারের সময়—৫ হাজার, ১০ হাজার অথবা ১৫ হাজার ডলারের তিনটি স্তরে। আবেদনকারীর ব্যক্তিগত পরিস্থিতি, ভ্রমণের উদ্দেশ্য ও ইন্টারভিউয়ের মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে এটি নির্ধারণ করবেন ভিসা কর্মকর্তা।

 

কীভাবে জমা দিতে হবে বন্ড

 

স্টেট ডিপার্টমেন্ট জানিয়েছে, কনস্যুলার কর্মকর্তার নির্দেশ ছাড়া কেউ বন্ড জমা দিতে পারবেন না। নির্দেশনা পাওয়ার পর আবেদনকারীকে যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের ফর্ম আই-৩৫২ পূরণ করতে হবে এবং মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের অনলাইন পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম Pay.gov-এর মাধ্যমে অর্থ জমা দিতে হবে। কোনো তৃতীয় পক্ষের ওয়েবসাইট বা মাধ্যম ব্যবহার করলে মার্কিন সরকার দায় নেবে না।

 

বন্ড জমা দেওয়া মানেই ভিসা নিশ্চিত—এমন নয় বলেও স্পষ্ট করেছে স্টেট ডিপার্টমেন্ট। তবে ট্রাভেল সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাস্তবে বন্ড দিতে বলা মানে ভিসা পাওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই বেশি থাকে।

 

নির্দিষ্ট বিমানবন্দর দিয়ে প্রবেশ বাধ্যতামূলক

 

ভিসা বন্ডের আওতায় যারা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করবেন, তাদের জন্য তিনটি নির্দিষ্ট বিমানবন্দর বেঁধে দেওয়া হয়েছে—বোস্টন লোগান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট, নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট এবং ওয়াশিংটন ডুলস ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। এই তিনটির বাইরে অন্য কোনো বিমানবন্দর দিয়ে প্রবেশ বা দেশত্যাগ করলে তা বন্ডের শর্ত ভঙ্গ হিসেবে গণ্য হবে এবং অর্থ ফেরত পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।

 

এছাড়া, অনুমোদিত সময়ের বেশি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান, আশ্রয় আবেদন বা অন্য ভিসায় রূপান্তরের চেষ্টা করলে বন্ড বাজেয়াপ্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করলে বন্ড স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে এবং অর্থ ফেরত দেওয়ার কথা জানিয়েছে স্টেট ডিপার্টমেন্ট—যদিও ফেরতের সময়সীমা স্পষ্ট করা হয়নি।

 

বাংলাদেশিদের উদ্বেগ ও সম্ভাব্য প্রভাব

 

ভিসা বন্ডের এই সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থী, প্রবাসী বাংলাদেশি ও ভিসাপ্রত্যাশীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে অধ্যয়নরত এক বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী বলেন, “আমার সমাবর্তনে বাবা-মাকে আনার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু এখন এত টাকা জামানত দেওয়ার বিষয়টি অনেক পরিবারের জন্য প্রায় অসম্ভব।”

 

বাংলাদেশের ট্রাভেল এজেন্সি সংশ্লিষ্টরাও বলছেন, এই সিদ্ধান্তে ট্যুরিস্ট ও ভিজিট ভিসার আবেদন কমে যেতে পারে। ট্রাভেল এজেন্সির মালিক কামরুজ্জামান রনি মনে করেন, এতে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পাশাপাশি ট্রাভেল এজেন্সি, এয়ারলাইন ও পর্যটন খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

 

তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশের নাম এই তালিকায় ওঠায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি নেতিবাচক বার্তা যেতে পারে—যেন বাংলাদেশি যাত্রীরা ‘হাই রিস্ক’। ভবিষ্যতে অন্য দেশগুলোর ভিসা নীতিও কঠোর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”

 

কেন এই সিদ্ধান্ত

 

বিশ্লেষকরা বলছেন, অবৈধ অভিবাসন ও ভিসার শর্ত লঙ্ঘন ঠেকাতেই এই বন্ড ব্যবস্থা জোরদার করছে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প প্রশাসন দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে অভিবাসন নীতিতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনের হার বাড়তে থাকায় সরকার মনে করছে, আর্থিক জামানতের মাধ্যমে অস্থায়ী ভিসাধারীদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেশত্যাগে বাধ্য করা যাবে।

 

পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬ লাখে—যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই প্রেক্ষাপটেই ভিসা বন্ড কর্মসূচিকে ১২ মাসের একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প হিসেবে সম্প্রসারণ করা হয়েছে।

 

সব মিলিয়ে, ২১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই ভিসা বন্ড ব্যবস্থা বাংলাদেশিদের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে বড় আর্থিক ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সব খবর

আরও পড়ুন

গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে এনজিও সহায়তার আহ্বান বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরের

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা কি প্রশ্নের মুখে? গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে এনজিও সহায়তার আহ্বান বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরের

উত্তর কোরিয়া এবং ফিলিস্তিনের চেয়েও দুর্বল বাংলাদেশী পাসপোর্ট

পাসপোর্ট ইনডেক্স ২০২৬ উত্তর কোরিয়া এবং ফিলিস্তিনের চেয়েও দুর্বল বাংলাদেশী পাসপোর্ট

অন্তর্ভুক্তিমূলক না হলে নির্বাচন গণতান্ত্রিক নয়

চার ব্রিটিশ এমপির বিবৃতি অন্তর্ভুক্তিমূলক না হলে নির্বাচন গণতান্ত্রিক নয়

অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত ব্যর্থতায় দীর্ঘায়িত হচ্ছে এলপিজি সংকট

দুই সপ্তাহেও সমাধান নেই অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত ব্যর্থতায় দীর্ঘায়িত হচ্ছে এলপিজি সংকট

অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত প্রস্তুতি ও সক্ষমতার ঘাটতিতে এডিপির আকার কমল ১৩ শতাংশ

স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বড় কাটছাঁট অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত প্রস্তুতি ও সক্ষমতার ঘাটতিতে এডিপির আকার কমল ১৩ শতাংশ

নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক মানে সবার অংশগ্রহণ

ইইউ পর্যবেক্ষক দলের প্রধান নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক মানে সবার অংশগ্রহণ

বাংলাদেশে নিযুক্ত নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে শপথ নিলেন ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন

বাংলাদেশে নিযুক্ত নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে শপথ নিলেন ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন

বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে ‘উদ্বেগজনক’ বললেন ব্রিটিশ এমপি প্রীতি প্যাটেল

ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার আহ্বান বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে ‘উদ্বেগজনক’ বললেন ব্রিটিশ এমপি প্রীতি প্যাটেল