সর্বশেষ

অপারেশন ডেভিল হান্ট

অপরাধ নয়, রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার

প্রকাশিত: ৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০
অপরাধ নয়, রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সরকারের ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্ক ও উদ্বেগ বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে এই অভিযানে প্রকৃত অপরাধীদের বদলে রাজনৈতিক পরিচয় ও মতাদর্শকে গ্রেপ্তারের প্রধান মানদণ্ড করা হচ্ছে—এমন অভিযোগ তুলেছেন মানবাধিকারকর্মী, বিশ্লেষক ও বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ।

 

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ ও ‘ডেভিল হান্ট ফেজ–২’—এই দুই ধাপে মোট ২৭ হাজার ৬৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পাশাপাশি, জুলাই–আগস্ট আন্দোলনের পর দায়ের হওয়া বিভিন্ন মামলা, ওয়ারেন্ট ও অভিযোগের ভিত্তিতে আরও প্রায় ৬০ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়। সব মিলিয়ে ৫ আগস্ট থেকে প্রায় ৫২০ দিনে গ্রেপ্তারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৭ হাজারে। তবে সমালোচকদের দাবি, এসব গ্রেপ্তারের বড় একটি অংশ রাজনৈতিক বিবেচনায় পরিচালিত এবং গ্রেপ্তারের শিকার অধিকাংশই আওয়ামী লীগ কিংবা অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতা কর্মী ও সমর্থক।

 

অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা–কর্মীদের পাশাপাশি অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সমর্থক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও নির্বিচারে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই যাদের কোনো ধরনের ফৌজদারি অপরাধে সম্পৃক্ততার প্রমাণ নেই, শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিচয় বা সমর্থনের অভিযোগেই তাদের আটক করা হয়েছে। মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের মতে, রাজনৈতিক সমর্থনকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা গণতান্ত্রিক অধিকার ও ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজ প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা। কিন্তু দুই ধাপে ২৭ হাজারের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হওয়ার পরও খুন, চাঁদাবাজি, ভূমি দখলের মতো অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর সাফল্য দেখা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ বা রাজনৈতিক সমর্থকদের বিশেষ অভিযানের নামে গ্রেপ্তার করা হলে সেটিকে ন্যায্য প্রক্রিয়া বলা যায় না। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য বা ‘কেস বাণিজ্য’ জড়িত থাকলে তা জনমনে বিভ্রান্তি ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

 

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, এই গ্রেপ্তার অভিযান চলমান প্রক্রিয়া। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১ মার্চ পর্যন্ত প্রথম দফায় দেশব্যাপী অপারেশন ডেভিল হান্ট পরিচালিত হয়, যেখানে ১২ হাজার ৫০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অভিযানটি দুই ধাপে পরিচালিত হচ্ছে, আইন-শৃঙ্খলার অযুহাতের আড়ালে যেটার একমাত্র লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীরা। তবে অভিযোগ উঠেছে, আওয়ামী লীগের সাথে সম্পৃক্ত নন এমন অনেককেও গ্রেপ্তারের পর ‘ফ্যাসিস্ট’ আখ্যা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে, যা স্থানীয় রাজনৈতিক সুবিধাভোগীদের জন্য সুযোগ তৈরি করছে।

 

সাধারণ নাগরিকদের গ্রেপ্তার নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। ঢাকা ও বিভিন্ন জেলা থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত নন—এমন ব্যক্তিদেরও যাচাই-বাছাই ছাড়াই আটক করে পরে অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে রাজনৈতিক মামলায় জড়ানো হচ্ছে। চুনারুঘাটে ৫৫ বছর ধরে পত্রিকা বিক্রি করা এক হকার এবং মাধবপুরে এক স্থানীয় সাংবাদিকের গ্রেপ্তারের ঘটনা জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে।

 

সাম্প্রতিক এক আইনশৃঙ্খলা বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করার যেকোনো অপচেষ্টা কঠোরভাবে দমন করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ১৩ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত ডেভিল হান্ট ফেজ–২–এ গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১৪ হাজার ৫৬৯ জন। এ সময় আগ্নেয়াস্ত্র, গোলাবারুদ, বিস্ফোরক ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের দাবি করা হয়েছে। মামলা ও ওয়ারেন্টভিত্তিক গ্রেপ্তারসহ এই সময়ে মোট গ্রেপ্তারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৮০৪ জনে।

সব খবর

আরও পড়ুন

গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে এনজিও সহায়তার আহ্বান বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরের

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা কি প্রশ্নের মুখে? গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে এনজিও সহায়তার আহ্বান বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরের

উত্তর কোরিয়া এবং ফিলিস্তিনের চেয়েও দুর্বল বাংলাদেশী পাসপোর্ট

পাসপোর্ট ইনডেক্স ২০২৬ উত্তর কোরিয়া এবং ফিলিস্তিনের চেয়েও দুর্বল বাংলাদেশী পাসপোর্ট

অন্তর্ভুক্তিমূলক না হলে নির্বাচন গণতান্ত্রিক নয়

চার ব্রিটিশ এমপির বিবৃতি অন্তর্ভুক্তিমূলক না হলে নির্বাচন গণতান্ত্রিক নয়

অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত ব্যর্থতায় দীর্ঘায়িত হচ্ছে এলপিজি সংকট

দুই সপ্তাহেও সমাধান নেই অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত ব্যর্থতায় দীর্ঘায়িত হচ্ছে এলপিজি সংকট

অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত প্রস্তুতি ও সক্ষমতার ঘাটতিতে এডিপির আকার কমল ১৩ শতাংশ

স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বড় কাটছাঁট অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত প্রস্তুতি ও সক্ষমতার ঘাটতিতে এডিপির আকার কমল ১৩ শতাংশ

নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক মানে সবার অংশগ্রহণ

ইইউ পর্যবেক্ষক দলের প্রধান নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক মানে সবার অংশগ্রহণ

বাংলাদেশে নিযুক্ত নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে শপথ নিলেন ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন

বাংলাদেশে নিযুক্ত নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে শপথ নিলেন ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন

বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে ‘উদ্বেগজনক’ বললেন ব্রিটিশ এমপি প্রীতি প্যাটেল

ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার আহ্বান বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে ‘উদ্বেগজনক’ বললেন ব্রিটিশ এমপি প্রীতি প্যাটেল