সর্বশেষ

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র

কোটা নিয়ে ফারুকীর সাথে মতভিন্নতা, অব্যাহতির পর আফসানার ক্ষোভ

প্রকাশিত: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৪:৪৭
কোটা নিয়ে ফারুকীর সাথে মতভিন্নতা, অব্যাহতির পর আফসানার ক্ষোভ

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সদ্য অব্যাহতি পাওয়া পরিচালক লেখক আফসানা বেগম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ চার পর্বের পোস্টে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জানিয়েছেন, কীভাবে বই নির্বাচন নীতিমালা সংস্কারের উদ্যোগে তিনি বাধার মুখে পড়েছিলেন। বিশেষ করে কোটা নিয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সঙ্গে মতভিন্নতাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায় বলে তিনি অভিযোগ করেছেন।

 

চব্বিশের দাঙ্গার পর গত ৫ সেপ্টেম্বর জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক পদে নিয়োগ পান আফসানা বেগম। তৎকালীন সংস্কৃতি উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের অনুরোধে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্বে যোগ দেওয়ার পর তিনি বই নির্বাচন নীতিমালা সংস্কারের উদ্যোগ নেন। তার প্রস্তাব ছিল, সচিব ও মন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত ২০ শতাংশ কোটা বাতিল করে ১০০ শতাংশ বই নির্বাচন কমিটির মাধ্যমে আনা হবে। এতে করে অযোগ্য ও মানহীন বই বাদ দিয়ে ভালো বই লাইব্রেরিতে পৌঁছানো সম্ভব হবে।  

 

কিন্তু এই প্রস্তাবে সম্মতি দেননি নতুন উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। আফসানা তার পোস্টে লিখেছেন, ফারুকী তাকে বলেছিলেন, “কোটা থাকুক। পরবর্তী সরকার এসে ব্যবহার করবে। এটা ওদের লাগবে।” এই বক্তব্যে তিনি বিস্মিত হন। তার মতে, কোটা থাকলে লাইব্রেরি কার্যকরভাবে অর্থ পাবে না, বরং নিম্নমানের বই চাপিয়ে দেওয়া হবে।

 

আফসানা অভিযোগ করেন, কোটার মাধ্যমে সচিব বা মন্ত্রীকে সন্তুষ্ট করতে পারলেই কোনো লাইব্রেরি নির্বাচিত হয়। এতে কোনো নিয়ম মানা হয় না, কোনো পরিদর্শন রিপোর্ট লাগে না। ফলে মানহীন বই বিপুল অর্থে কেনা হয় এবং লাইব্রেরিগুলোতে পাঠানো হয়। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, একজন অতিরিক্ত সচিবের লেখা “আমার স্ত্রীর জন্মদিনে লেখা ৫০ কবিতা” বইটি গ্রন্থকেন্দ্র এক হাজার কপি কিনেছিল। আবার আগের আমলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বইও বিপুল অর্থে কেনা হয়েছে।  

 

তার দাবি, তিনি এসবের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। এজন্যই তাকে হঠাৎ করে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তিনি লিখেছেন, “যে কোনো মূল্যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মানহীন বইয়ের বিপক্ষে আমার অবস্থান ছিল।”  

 

আফসানা আরও জানান, ফারুকী তাকে বলেছিলেন, কোটা শব্দটি বাদ দিয়ে অন্যভাবে বলা যেতে পারে, যেমন সংরক্ষিত। কিন্তু তিনি মনে করেন, আসল সমস্যাই হলো এই কোটা ব্যবস্থা।  

 

তার দীর্ঘ লেখায় উঠে এসেছে মন্ত্রণালয়ের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অবহেলার চিত্র। তিনি অভিযোগ করেন, গ্রন্থকেন্দ্রের ফাইলগুলো দুই থেকে আড়াই মাস মন্ত্রণালয়ে পড়ে থাকত। সচিব বা উপদেষ্টা কখনো গ্রন্থকেন্দ্রের কাজ সম্পর্কে জানতে চাইতেন না। বরং তারা কেবল রুটিন কাজেই সীমাবদ্ধ রাখতেন।  

 

প্রকাশকদের সমালোচনা করে আফসানা লিখেছেন, অনেক প্রকাশক ভারতীয় বই ফটোকপি করে নিম্নমানের মুদ্রণে প্রকাশ করছেন। একই বই ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশনার নামে জমা দিয়ে গ্রন্থকেন্দ্রে বিক্রির চেষ্টা করছেন। অনুবাদের ক্ষেত্রেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তার মতে, ইউরোপ বা আমেরিকায় বেস্টসেলার বইগুলো এআই দিয়ে নিম্নমানের অনুবাদে প্রকাশ করা হচ্ছে, অথচ গ্রন্থকেন্দ্রকে সেগুলো কিনতে হচ্ছে।  

 

তিনি আরও জানান, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের মাধ্যমে সম্পাদনার প্রশিক্ষণ, প্রকাশনার উন্নয়ন, কপিরাইট প্রয়োগ বা আন্তর্জাতিক বইমেলা আয়োজনের মতো কাজ করা সম্ভব হলেও এসব বিষয়ে কোনো মনোযোগ নেই। বরং কেবল বই কেনাকাটাকেই গ্রন্থকেন্দ্রের মূল কাজ হিসেবে দেখা হয়।  

 

তার পোস্টে আরও উঠে এসেছে তাজউদ্দীন আহমদকে নিয়ে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রসঙ্গ। তিনি জানান, এ কারণে মন্ত্রণালয়ের সচিব নাখোশ হয়েছিলেন এবং তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয়েছিল। তার মতে, দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের কথা শিক্ষার্থীদের জানানো উচিত ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে তাকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে।  

 

আফসানা মনে করেন, নির্বাচনের কয়েকদিন আগে তাকে বহিষ্কার করা জুলাই স্পিরিটের বিপরীতে কাজ করার উদাহরণ। তিনি লিখেছেন, “মানুষের সৎ প্রচেষ্টা দলগত নির্বুদ্ধিতা ও অসততার কাছে জিম্মি।”

 

শেষে তিনি সহকর্মীদের প্রতি দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, তারা প্রতিষ্ঠান নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেছিলেন, কিন্তু তার অব্যাহতির কারণে সেই স্বপ্নে হতাশা এসেছে। তিনি লিখেছেন, “আমার কারণে যে তাদের সেই স্বপ্নে হতাশা এল, এই বেদনা ভয়াবহ। তাঁরা যেন আমাকে ক্ষমা করেন।”

সব খবর

আরও পড়ুন

গণপরিষদ, সংবিধান সংস্কার ও ‘১৮০ কার্যদিবস’ নিয়ে বিভ্রান্তি

ভোটে জয় মানেই সরকার গঠন নয় গণপরিষদ, সংবিধান সংস্কার ও ‘১৮০ কার্যদিবস’ নিয়ে বিভ্রান্তি

বাজার অস্থিরতার মাঝেই ফের বাড়লো এলপিজি গ্যাসের দাম

১২ কেজি সিলিন্ডার ১,৩৫৬ টাকা বাজার অস্থিরতার মাঝেই ফের বাড়লো এলপিজি গ্যাসের দাম

শেষ মুহুর্তে গোঁজামিলের বিতর্কিত প্রকল্প নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার

চাপ বাড়বে নির্বাচিত সরকারের ওপর শেষ মুহুর্তে গোঁজামিলের বিতর্কিত প্রকল্প নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার

দুদক সংস্কারে অন্তত সাত উপদেষ্টার আপত্তি: ড. ইফতেখারুজ্জামান

দুদক সংস্কারে অন্তত সাত উপদেষ্টার আপত্তি: ড. ইফতেখারুজ্জামান

অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে তড়িঘড়ি একের পর এক সিদ্ধান্ত

দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ও ব্যয় নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে তড়িঘড়ি একের পর এক সিদ্ধান্ত

নির্বাচনে ধর্মকে ব্যবহার করে ভোট চাওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনক

আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর বিবৃতি নির্বাচনে ধর্মকে ব্যবহার করে ভোট চাওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনক

বাংলাদেশে নির্বাচন: পর্দার আড়ালে কি এখনও শক্তিশালী ভূমিকা রাখছে সেনাবাহিনী?

আল জাজিরার প্রতিবেদন বাংলাদেশে নির্বাচন: পর্দার আড়ালে কি এখনও শক্তিশালী ভূমিকা রাখছে সেনাবাহিনী?

কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই বাংলাদেশে আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ছে

রয়টার্সের প্রতিবেদন কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই বাংলাদেশে আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ছে