ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশীয় পর্যবেক্ষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচন কমিশনের অনুমোদন পাওয়া ৮১টি নিবন্ধিত পর্যবেক্ষক সংস্থা থেকে মোট ৫৫ হাজার ৪৫৪ জন পর্যবেক্ষক দায়িত্ব পালন করবেন। তবে এর মধ্যে মাত্র ১৭টি সংস্থা থেকেই নিয়োগ পেয়েছেন ৩৫ হাজার ৪২৭ জন—যা মোট পর্যবেক্ষকের প্রায় ৬৪ শতাংশ। নির্দিষ্ট কয়েকটি সংস্থা থেকে বিপুলসংখ্যক পর্যবেক্ষক নিয়োগ পাওয়া নির্বাচন পর্যবেক্ষণের নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের জনসংযোগ পরিচালক মো. রুহুল আমিন মল্লিক স্বাক্ষরিত চিঠি অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি পর্যবেক্ষক নিয়োগ পেয়েছে পিপলস অ্যাসোসিয়েশন ফর সোশ্যাল অ্যাডভান্সমেন্ট (পাশা)। শুধু এই একটি সংস্থা থেকেই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে ১০ হাজার ৫৫৯ জন পর্যবেক্ষকের। এছাড়া কমিউনিটি অ্যাসিস্ট্যান্স ফর রুরাল ডেভেলপমেন্ট (কার্ড), রিয়ান মনি সোসাইটি, সংগতি সমাজ কল্যাণ সংস্থা, রিসডা বাংলাদেশ, বিবি আছিয়া ফাউন্ডেশন, ইম্প্যাক্ট ইনিশিয়েটিভসহ কয়েকটি সংস্থা থেকে হাজারের বেশি পর্যবেক্ষক নিয়োগ পেয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এত বড় সংখ্যক পর্যবেক্ষক বাস্তবে মাঠে মোতায়েন, প্রশিক্ষণ, নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো—কিছু সংস্থার সাংগঠনিক সক্ষমতা ও অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে কুড়িগ্রামের ‘গরিব উন্নয়ন সংস্থা’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কথা উঠে এসেছে, যেখান থেকে ১ হাজার ৭৮ জন পর্যবেক্ষক নিয়োগ পেয়েছেন। স্থানীয় সূত্র জানায়, এক কক্ষের একটি অফিসে বাবা-ছেলে পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সীমিত হলেও তারা বিপুলসংখ্যক পর্যবেক্ষণের অনুমতি পেয়েছে।
একইভাবে ‘পাশা’ ২০১৪ সালে এনজিও ব্যুরো থেকে নিবন্ধন পেলেও ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতা ছিল। এবার তারা অন্য একটি ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যৌথভাবে পর্যবেক্ষণের কথা বললেও সুনির্দিষ্টভাবে কতজন মাঠে থাকবে, সে বিষয়ে সংস্থাটির পক্ষ থেকে পরিষ্কার তথ্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে, কিছু পর্যবেক্ষক সংস্থার সঙ্গে রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও উঠেছে। কয়েকটি সংস্থা মিলিয়ে মোর্চা গঠনের তথ্য সামনে এসেছে, যেখানে নেতৃত্বে রয়েছেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। এতে পর্যবেক্ষণের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে বলে মনে করছেন সুশাসন সংশ্লিষ্টরা।
নির্বাচন কমিশনার তাহমিদা আহমেদ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, কোনো সংস্থা বা পর্যবেক্ষকের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এখন পর্যন্ত কমিশন পর্যবেক্ষক বাছাইয়ের মানদণ্ড, যাচাই প্রক্রিয়া বা সক্ষমতা মূল্যায়ন নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি।
এবারের নির্বাচনে দেশীয় পর্যবেক্ষকের পাশাপাশি ৩৯টি দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে প্রায় ৫০০ বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক পর্যবেক্ষণে অংশ নিচ্ছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন একাই পাঠাচ্ছে প্রায় ২০০ জন পর্যবেক্ষক।
সব মিলিয়ে, নির্বাচন পর্যবেক্ষণে সংখ্যার আধিক্য থাকলেও যোগ্যতা, নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত না হলে তা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করার বদলে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে—এমন আশঙ্কাই এখন জোরালো।