বাংলাদেশের কৃষি খাত দীর্ঘদিন ধরে নানা সংকটে ভুগছে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও কৃষকরা ফসলের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। কৃষিজমির পরিমাণ প্রতিদিন কমছে, প্রায় ৫৬ শতাংশ জমি উৎপাদনশীলভাবে ব্যবহার হচ্ছে না। দেশের ৪০ শতাংশ কৃষক পরিবার ভূমিহীন বর্গাচাষী, আর অর্ধেক কৃষক যথাযথ মজুরি পান না। যাদের হাতে বেশি জমি আছে তারা কৃষিকাজে সক্রিয় নন। ফলে কৃষি খাতের উৎপাদনশীলতা ও প্রবৃদ্ধি কমছে, বিপরীতে খাদ্যশস্য আমদানি বাড়ছে।
১৯৮৮ সালে ইউএনডিপি ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ উদ্যোগে কৃষি খাতের প্রথম রিভিউ হয়। এরপর ১৯৯০ সালে আরেকটি অর্থনীতি রিভিউ করা হয়। তখন যান্ত্রিকীকরণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও ফসল বৈচিত্র্যকরণের সুপারিশ করা হয়েছিল। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেয়। সেচ সম্প্রসারণ, উন্নত বীজ ও সার ব্যবস্থাপনা, গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রমে বেসরকারি খাতকে যুক্ত করা হয়। এতে কৃষিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। তবে এরপর গত ৩৫ বছরে আর কোনো সংস্কার উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কৃষি সংস্কার কমিশন গঠনের প্রত্যাশা থাকলেও তা হয়নি। বরং খাদ্যশস্য আমদানি বেড়েছে। গত পাঁচ দশকে কৃষিতে প্রবৃদ্ধি ছিল গড়ে ৩ শতাংশ, যা গত অর্থবছরে ২ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। নীতিসহায়তার অভাবে কৃষির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিল্প খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত থাকার কারণে কৃষি মন্ত্রণালয় পর্যাপ্ত মনোযোগ পায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভূমি বণ্টনে বড় বৈষম্য বিরাজ করছে। আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৫৬ শতাংশ গ্রামীণ পরিবারের কোনো জমি নেই। প্রান্তিক চাষীর হার ৪১ শতাংশ। প্রতি বছর শূন্য দশমিক ২ শতাংশ হারে কৃষিজমি কমছে। জলবায়ুর অভিঘাতেও উৎপাদন কমছে। বিনিয়োগের অভাবে আমদানিনির্ভরতা বাড়ছে। সেচ যন্ত্রের ৮০ শতাংশ বিদেশ থেকে আসছে। সার, বীজ ও কীটনাশকের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চাল ও গম আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ২৩০ কোটি ৬০ লাখ ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১২ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। ডালের আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশ। এ সময়ে ১৪ লাখ ৩৬ হাজার টন চাল ও ৬২ লাখ ৩৫ হাজার টন গম আমদানি করা হয়। কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কৃষি উৎপাদন বাড়াতে সংস্কার ও বিনিয়োগ জরুরি।
বীজের ক্ষেত্রেও আমদানিনির্ভরতা বেশি। ভুট্টার ৯০ শতাংশ, সবজির ৬০ শতাংশ, পাটের ৭০ শতাংশের বেশি বীজ আমদানি করতে হয়। তেলবীজ ও মসলার বীজের ৮০ শতাংশের বেশি বিদেশ থেকে আসে। গবেষণা ও দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে যথেষ্ট উদ্যোগ দেখা যায়নি। একইভাবে কীটনাশকের ক্ষেত্রেও আমদানিনির্ভরতা রয়েছে। বিদেশি কীটনাশকে মাত্র ৫ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়, অথচ দেশীয় উৎপাদনের কাঁচামালে ৫৮ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক দিতে হয়। ফলে কৃষকের ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
সার সংকটও কৃষকদের ভোগাচ্ছে। অনেক সময় সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি হয়েছে। অসাধু ব্যবসায়ী ও ডিলাররা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত মুনাফা লুটছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ও স্বীকার করেছে যে সার কারসাজিতে বিএডিসি ও বিসিআইসি’র ডিলাররা জড়িত।
সবজির দাম অস্থিরতা ও আলুচাষীদের লোকসান কৃষি খাতের আরেকটি বড় সমস্যা। সরকার বাজার থেকে আলু কেনার ঘোষণা দিলেও বাস্তবে কৃষকরা হিমাগারে ৮ থেকে ১৫ টাকায় আলু বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষি খাতকে এগিয়ে নিতে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন জরুরি। দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো, যান্ত্রিকীকরণ, ভর্তুকি প্রদান এবং নীতিগত সহায়তা ছাড়া কৃষি খাত টেকসই হবে না। সামনে নির্বাচনের পর নতুন সরকারকে কৃষি সংস্কার কমিশন গঠন করে মাঠ থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত পর্যালোচনা করে সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকার ২০৫০ সালকে লক্ষ্য করে কৃষির দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান করছে। তবে কৃষি মন্ত্রণালয় দাবি করছে, তারা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেছেন, কৃষি খাতকে কম গুরুত্ব দেয়া হয়নি, বরং পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ চলছে। তবে বাস্তবতা বলছে, কৃষি সংস্কার ছাড়া দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়বে।