বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে তিনটি বিভাগে উপপরিচালক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি ঘিরে তীব্র অসন্তোষ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে। তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে একাডেমিতে কর্মরত কর্মকর্তাদের বঞ্চিত করে বিএনপির কিছু কর্মীকে নিয়োগ দিতেই এই নিয়োগ প্রক্রিয়া এগোচ্ছে। অনেকের অভিযোগ, এটি শুধু প্রশাসনিক বৈষম্য নয়, বরং রাজনৈতিক নিয়োগেরই নতুন আয়োজন।
গত ২৪ ডিসেম্বর উপপরিচালক (নাট্যকলা), উপপরিচালক (চারুকলা) ও উপপরিচালক (প্রশাসন) পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে শিল্পকলা একাডেমি। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরপরই কর্মকর্তা কল্যাণ সমিতিসহ একাডেমির তিনটি সংগঠন এই নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিলের দাবি জানিয়ে মহাপরিচালক ও সংস্কৃতি উপদেষ্টার কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দেয়। কর্মকর্তা কল্যাণ সমিতির চিঠিতে ৪৪ জন কর্মকর্তার স্বাক্ষর রয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, ১৯৯২ সালের অসম্পূর্ণ ও যুগোপযোগী নয়—এমন চাকরিবিধি বহাল রেখেই এই নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, যা একাডেমির অভ্যন্তরীণ কর্মীদের জন্য চরম বৈষম্যমূলক। কর্মীদের অভিযোগ, গত আগস্টে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে আগে চাকরিবিধি সংশোধন এবং পদোন্নতির সিদ্ধান্ত হলেও, তা বাস্তবায়ন না করে তড়িঘড়ি করে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে।
একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির বয়সসীমা ৩৫ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ এখানে এমন কর্মকর্তা আছেন, যারা ২০–২৫ বছর ধরে কাজ করছেন। এখন তাদের একজন নবীন ও বাইরের লোকের অধীনে কাজ করতে হবে—এটা অপমানজনক ও নিপীড়নমূলক।”
কর্মীদের বড় একটি অংশ মনে করছেন, এই নিয়োগের নেপথ্যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। তাদের অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে উপপরিচালক পদে নিয়োগ দিয়ে বিএনপি-ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের শিল্পকলায় স্থায়ীভাবে বসানোর চেষ্টা চলছে। এই আশঙ্কা আরও জোরালো হয়েছে, কারণ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ (রেজাউদ্দিন স্টালিন) বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। কর্মীদের মতে, এই বৈঠক নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে চলমান গুজব ও সন্দেহকে আরও উসকে দিয়েছে।
যদিও শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক গণমাধ্যমকে বলেছেন, তিনি কর্মীদের কোনো চিঠি পাননি এবং সবকিছু নিয়ম মেনেই হচ্ছে। তার দাবি, একাডেমির কাজের পরিধি বাড়লেও জনবল নেই, তাই উপপরিচালক নিয়োগ জরুরি।
তবে কর্মীরা এই যুক্তি মানতে নারাজ। তাদের বক্তব্য, শিল্পকলায় উপপরিচালক পদে কাজ করার মতো যোগ্য কর্মকর্তা ভেতরেই রয়েছেন, কিন্তু রাজনৈতিক বিবেচনায় তাদের উপেক্ষা করা হচ্ছে। অতীতে পরিচালক ও মহাপরিচালক পদে চুক্তিভিত্তিক রাজনৈতিক নিয়োগের কারণে প্রশাসনিক অদক্ষতা, অনিয়ম ও কর্মপরিবেশের অবনতি হয়েছে বলেও তারা অভিযোগ করেন।
এদিকে শিল্পকলা একাডেমি (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫ ঘিরেও নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সংশোধিত অধ্যাদেশে বিভাগের সংখ্যা বাড়লেও আবৃত্তি ও প্রশিক্ষণ বিভাগের নাম বাদ পড়েছে। জেলা শিল্পকলার কর্মকর্তারা বলছেন, প্রশিক্ষণ বিভাগই শিল্পকলার প্রাণ। এই বিভাগ বাদ পড়ায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাজারো শিক্ষার্থীর প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ভবিষ্যতে কীভাবে চলবে, তা অনিশ্চিত।
মহাপরিচালক দাবি করছেন, কোনো কার্যক্রম বন্ধ হয়নি, শুধু বিভাগগুলোর পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। কিন্তু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতে, পরিষ্কার কাঠামো ও দায়িত্ব বণ্টন ছাড়া এই পরিবর্তন আরও বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে।
সব মিলিয়ে শিল্পকলা একাডেমিতে এখন নিয়োগ, প্রশাসন ও কাঠামোগত সংস্কার—সবকিছু নিয়েই গভীর অনাস্থা তৈরি হয়েছে। কর্মীরা বলছেন, পরিচালনা পরিষদকে কার্যকর করা, চাকরিবিধি সংশোধন এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন ছাড়া শিল্পকলার সংকট কাটবে না।