বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন অভাবের চাপে খুঁড়িয়ে চলছে। সরকারি কোষাগারে ভাটার টান, রাজস্ব আয় কম, বিনিয়োগ স্থবির, কর্মসংস্থান নেই—সব মিলিয়ে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের ঘরে ঘুরপাক খাচ্ছে। এই বাস্তবতায় বিএনপি ও জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া বড় বড় প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বিএনপি বলছে, ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশকে আধুনিক উচ্চ-মধ্যম আয়ের রাষ্ট্রে রূপান্তর করবে এবং এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়বে। অন্যদিকে জামায়াত আরও উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য দিয়েছে—২০৪০ সালের মধ্যে অর্থনীতিকে দুই ট্রিলিয়ন ডলার এবং মাথাপিছু আয় ১০ হাজার ডলারে উন্নীত করবে। বিএনপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য রেখেছে ৮.৫ শতাংশ, আর জামায়াত বলছে তারা ৯.৭ শতাংশ অর্জন করবে। অথচ বিদায়ী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৩.৯৭ শতাংশ।
বিএনপি বেকারদের ছয় মাস ভাতা, কৃষিঋণ মওকুফ, ফ্যামিলি কার্ড চালু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জামায়াতও প্রতিটি জেলায় বিশেষায়িত হাসপাতাল, বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা, তরুণদের জন্য প্রশিক্ষণ ও চাকরির সুযোগ তৈরির মতো প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু এসব বাস্তবায়নে বিপুল অর্থের প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ, বিএনপির ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি চালু করতে বছরে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা লাগবে, যা বর্তমান সামাজিক সুরক্ষা বাজেটের দ্বিগুণ। জামায়াতের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ৬৪ জেলায় বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণে খরচ হবে এক লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা, অথচ স্বাস্থ্য খাতে বর্তমান বাজেট মাত্র ৪২ হাজার কোটি।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেছেন, এসব প্রতিশ্রুতি অনেকটাই উচ্চাভিলাষী। বিএনপি ও জামায়াতের লক্ষ্য পূরণ করতে হলে প্রতিবছর ডলারের অঙ্কে প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে ৮ থেকে ৯ শতাংশ, যা বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় অসম্ভব। তিনি মনে করেন, নির্বাচনী ইশতেহারের উদ্দেশ্য মূলত ভোটারদের স্বপ্ন দেখানো, বাস্তবায়নযোগ্যতা নয়।
সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেছেন, প্রতিশ্রুতি পূরণে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে—আর্থিক সক্ষমতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা। রাজস্ব আদায় কম, বিনিয়োগ স্থবির, সামাজিক-রাজনৈতিক প্রতিরোধও আছে। ফলে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন কঠিন।
বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতায় আসার পর দলগুলোর উচিত হবে প্রথম ১০০ দিনের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা করা। ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের আস্থা ফেরানো, বিনিয়োগ বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা—এসবই হবে অগ্রাধিকার। না হলে বড় বড় প্রতিশ্রুতি কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।