আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ‘অংশগ্রহণমূলক’ ও ‘প্রতিযোগিতামূলক’ ভোটের কথা বললেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। নিবন্ধিত ৬০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে অন্তত ২১টি দল দলীয়ভাবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না; কার্যক্রম নিষিদ্ধ ও নিবন্ধন স্থগিত থাকায় দেশের বৃহত্তম দল আওয়ামী লীগও ভোটের বাইরে। অন্যদিকে অংশ নেওয়া অনেক দলই সীমিত আসনে প্রতীকী প্রার্থী দিয়েছে। ফলে বড় ভোটভাগধারী দলগুলোর অনুপস্থিতি, প্রার্থী সংকট, সাংগঠনিক দুর্বলতা ও মাঠপর্যায়ের ভীতি—সব মিলিয়ে নির্বাচনটি আদৌ ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ বা ‘অংশগ্রহণমূলক’ হচ্ছে কি না, সে প্রশ্ন জোরালো হয়ে উঠছে।
একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মূল বৈশিষ্ট্য হলো—ফলাফলের অনিশ্চয়তা, ভোটারদের সামনে বিকল্প রাজনৈতিক ধারার উপস্থিতি, সমান সুযোগ, প্রভাবমুক্ত ভোটদান এবং ক্ষমতার রদবদলের বাস্তব সম্ভাবনা। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে এসব শর্তের বেশ কয়েকটিই দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তি আওয়ামী লীগ ও তাদের শরিকদের বাইরে রেখে নির্বাচন হওয়ায় সরকার গঠনের সমীকরণ আগেই অনেকটা নির্ধারিত—এমন আশঙ্কা রয়েছে।
ইসি সূত্র বলছে, ৩০টিরও কম দলকে সক্রিয়ভাবে মাঠে দেখা যাচ্ছে। ২৯টি দল মাত্র ১ থেকে ২০টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে; এর মধ্যে ১৯টি দল ১০টির কম আসনে সীমাবদ্ধ, ১২টি দল পাঁচটিরও কম আসনে। বিপরীতে শতাধিক আসনে প্রার্থী দিতে পেরেছে মাত্র চার-পাঁচটি দল। সংখ্যায় প্রার্থী বেশি হলেও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও সাংগঠনিক শক্তি সীমিত—এমন অভিযোগও রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগ ও তাদের জোটভুক্ত দলগুলোর সম্মিলিত ভোটভাগ অতীতে প্রায় ৫০–৫৫ শতাংশে পৌঁছেছে। এই বিপুল অংশের ভোটার কার্যত প্রতিনিধিত্বহীন থাকলে নির্বাচনকে সর্বজনীন বলা কঠিন। সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম সম্প্রতি বলেন, বড় একটি অংশের ভোটার তাদের পছন্দের প্রার্থী বেছে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না; ফলে ‘ইনক্লুসিভ ভোটিং’-এর মানদণ্ড পূরণ হচ্ছে না।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও শেষ সময়ে একই ধরনের উদ্বেগ তুলেছেন। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার ও নির্বাচনী ভিত্তি মজবুত করার যে প্রত্যাশা ছিল, তা পুরোপুরি পূরণ হয়নি। নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলো দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক শক্তি গড়ে তুলতে ব্যর্থ হওয়ায় ভোটারদের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নীল দলের শিক্ষকরা বিবৃতিতে বলেছেন, সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচন ‘প্রহসন ও প্রতারণার শামিল’ হবে। তাদের মতে, একতরফা নির্বাচন দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পারে এবং রাজনৈতিক সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
এদিকে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর ভেতরেও অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। জাতীয় পার্টি (জাপা) ১৯৬ আসনে প্রার্থী দিলেও নির্বাচন সামনে রেখে একের পর এক প্রার্থী সরে দাঁড়াচ্ছেন। মামলা, ভয়ভীতি ও প্রচারণায় বাধার অভিযোগ তুলে বগুড়া ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দুই প্রার্থী ইতিমধ্যে প্রত্যাহার করেছেন। নীলফামারীতে দলীয়ভাবে বিএনপি প্রার্থীকে সমর্থনের ঘটনাও ঘটেছে। বিভিন্ন জেলায় শত শত নেতাকর্মীর বিএনপিতে যোগ দেওয়ার খবর মিলেছে। এতে প্রশ্ন উঠছে—যে দলগুলো অংশ নিচ্ছে, তাদের অংশগ্রহণ কতটা কার্যকর?
মাঠপর্যায়ে আচরণবিধি লঙ্ঘন, সহিংসতা, মামলা-হামলা ও প্রশাসনিক দ্বিচারিতার অভিযোগও রয়েছে। ঋণখেলাপি বা মামলা থাকা প্রার্থীদের বিষয়ে আইন প্রয়োগে বৈষম্যের কথাও বলছেন পর্যবেক্ষকরা। এসব কারণে সমান সুযোগের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন মনে করেন, কোনো দলকে নির্বাহী আদেশে বাইরে রাখা রাজনৈতিক সমাধান নয়; বরং ভোটারদের রায়ের মাধ্যমেই দলগুলো ‘খারিজ’ হওয়া উচিত। লেখক মহিউদ্দিন আহমদও বলেন, বড় দলকে বাদ দিয়ে নির্বাচন হলে গ্রহণযোগ্যতা সংকট তৈরি হয়—এ অভিজ্ঞতা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন নয়।
তবে নির্বাচন কমিশনের দাবি, অধিকাংশ দল ভোটে থাকায় নির্বাচন অংশগ্রহণমূলকই হচ্ছে। কমিশনারদের মতে, ভালো ভোটার উপস্থিতি থাকলে বিতর্ক কমবে। কিন্তু বিশ্লেষক জেসমিন টুলীর ভাষায়, ভোটার উপস্থিতি কম হলে বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা দুর্বল হলে নির্বাচনের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন উঠবে।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, সংখ্যার হিসেবে প্রার্থী ও দল থাকলেও রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় অংশের ভোটার প্রতিনিধিত্বহীন, অনেক দলের সাংগঠনিক উপস্থিতি দুর্বল, আবার অংশ নেওয়া দলগুলোর ভেতরেও ভীতি ও সরে দাঁড়ানোর প্রবণতা বাড়ছে। ফলে নির্বাচনটি কাগজে-কলমে ‘অংশগ্রহণমূলক’ হলেও কার্যত ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ বা ‘প্রতিযোগিতামূলক’ মানদণ্ড পূরণ করছে কি না—সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।