বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবি ড. শাহদীন মালিক এর সাথে দৈনিক কালের কণ্ঠে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে ক্ষমতার পালাবদল, অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা, বিএনপি ও আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কৌশল এবং আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান। সাক্ষাৎকারটি থেকে স্পষ্ট হয়—দেশে গণতন্ত্রের সংকট, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং জনগণের প্রত্যাশা নিয়ে নানা প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে।
সাক্ষাৎকারে ড. শাহদীন মালিক বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জনগণের প্রত্যাশা ছিল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরবে। কিন্তু বাস্তবে নানা সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক চাপ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থার ঘাটতি এখনো কাটেনি। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো—একদিকে আন্তর্জাতিক মহলের চাপ সামলানো, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনরুদ্ধার করা।
বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ প্রসঙ্গে এই প্রবীণ আইনজীবি বলেছেন, আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পর এখন নতুন বাস্তবতায় পড়েছে। শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কৌশল কী হবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। অনেকেই মনে করছেন, আওয়ামী লীগকে এখন নতুন নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হবে এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে হবে।
বিএনপির রাজনীতি নিয়ে তিনি বলেছেন বর্তমানে রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও দলটির ভেতরে নানা দ্বন্দ্ব রয়েছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলটি নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। তবে প্রশ্ন উঠছে—বিএনপি কি সত্যিই জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে? তিনি মনে করেন, বিএনপিকে শুধু আন্দোলন নয়, নীতিগতভাবে স্পষ্ট কর্মসূচি দিতে হবে।
সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে আন্তর্জাতিক প্রভাব সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও চীনের ভূমিকাকে অস্বীকার করা যায় না। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতি, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এবং চীনের অর্থনৈতিক বিনিয়োগ বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করছে। অন্তর্বর্তী সরকারকে এসব ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে।
জনগণ এখন চায়—একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ, যেখানে তারা নিরাপদে জীবনযাপন করতে পারবে। সাক্ষাৎকারে ড. শাহদীন মালিক বলেছেন জনগণের আস্থা অর্জন করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে। দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দলীয় আধিপত্য কমাতে হবে।
সাক্ষাৎকারে নির্বাচন প্রসঙ্গও উঠে এসেছে। বলা হয়েছে, একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ছাড়া রাজনৈতিক সংকট কাটবে না। অন্তর্বর্তী সরকারকে নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য আস্থা তৈরি করতে হবে।
এছাড়া গণভোটের যে চারটি প্রস্তাব, চারটি প্রস্তাবের পেছনে আরো প্রায় ৩০টি লেজুড় রয়েছে; এইসব পড়ে বুঝে মতামত দেওয়া বা প্রস্তাবগুলো মূল্যায়ন করার জন্য যে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রয়োজন, বেশির ভাগ ভোটারের তা নেই। গণভোটের পক্ষে একটা জোয়ার উঠেছিল, কিন্তু যেভাবে এই ভোটের ব্যবস্থা করা হয়েছে, তাঁর দৃষ্টিতে এটা অবাস্তব। গণভোটের বাক্সে যদি ব্যালট কম পড়ে তাহলে নির্বাচনের মাধ্যমে যে সংসদ গঠিত হবে, সেই সংসদের ওপর গণভোট মানার নৈতিক চাপটা অনেক কমে যাবে বলে মনে করেন তিনি।
সাক্ষাৎকারে জনাব শাহদীন মালিক আরো বলেছেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন নতুন ধারা তৈরি হচ্ছে। পুরনো দলগুলোকে নিজেদের পুনর্গঠন করতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে রাজনীতিতে যুক্ত করতে হবে। না হলে জনগণের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের দূরত্ব আরও বাড়বে।
সাক্ষাৎকার থেকে স্পষ্ট হয়, বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। অন্তর্বর্তী সরকার, আওয়ামী লীগ, বিএনপি—সব পক্ষকেই নতুন করে ভাবতে হবে। জনগণের আস্থা অর্জন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনই হতে পারে সংকট সমাধানের পথ।